দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০টি আধুনিক আবাসিক স্কুল ও কলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে একটি বালক এবং একটি বালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাবিত এসব প্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠদানের মধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন, খেলাধুলা, সাঁতার, সাংস্কৃতিক চর্চা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশাল এই উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন কিংবা বিদেশি অর্থায়ন কোনোটিই এখনো নিশ্চিত হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রস্তাবিত প্রকল্পটির নাম ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত এলাকাসমূহে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ’। বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকার কথা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩১ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩০ শতাংশ এবং বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাকি ৭০ শতাংশ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক, জাইকা, কোরিয়ার ইডিসিএফ এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মতো সংস্থার কাছ থেকে অর্থায়নের সম্ভাবনা বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে কোনো সংস্থার কাছ থেকেই এখন পর্যন্ত অর্থায়নের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
প্রস্তাবিত ব্যয় ৬০০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করলে প্রতিটির জন্য গড় ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। প্রতিটি স্কুল নির্মাণে প্রায় তিন একর জমির প্রয়োজন হবে। সেই হিসাবে সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ একর জমি লাগবে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী ৬০০টি প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ধারণক্ষমতা হতে পারে প্রায় ছয় লাখ। পাশাপাশি প্রতিটি স্কুলে প্রায় ৪৫ জন করে শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। সব মিলিয়ে শিক্ষক প্রয়োজন হবে প্রায় ২৭ হাজার।
শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের পরীক্ষাগার থাকবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস এবং তথ্যপ্রযুক্তি চর্চার জন্য বিশেষ ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। থাকবে ডিজিটাল লাইব্রেরি ও ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, কোরীয়, আরবি ও চীনা ভাষা শেখানোর জন্য ভাষা ল্যাব রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে যুক্ত হতে পারে, সে জন্য সংগীত, নাচ, নাটক, চিত্রকলা, বিতর্ক ও বিজ্ঞান ক্লাবের সুযোগও রাখা হবে।
আবাসিক সুবিধার অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ১০০ আসনের হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট, ইনডোর গেমস এবং সাঁতার শেখার জন্য সুইমিংপুলের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় রান্নাঘর, খাবার ঘর, চিকিৎসাকক্ষ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকতে পারে। মেয়েদের জন্য আলাদা কমনরুম ও স্বাস্থ্যসম্মত সুবিধার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নিরাপত্তার জন্য সীমানাপ্রাচীর, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ, সিসিটিভি ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হবে। পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়তে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৃক্ষরোপণের মতো উদ্যোগও প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সহায়তা নিশ্চিত করা সহজ হবে না। দ্বিতীয়ত, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে উপযুক্ত জমি সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের মধ্যে ৬০০টি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষকসহ বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হওয়ার পর শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, আবাসন, খাবার, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কীভাবে বহন করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য চার কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এই সমীক্ষায় জমির প্রাপ্যতা, স্থান নির্বাচন, নির্মাণ ব্যয়, অর্থায়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। এরপর সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিস্তারিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করার কথা।
অর্থাৎ, ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০টি আধুনিক আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে এলেও এখনই এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। অর্থায়ন, জমি ও পরিচালন ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হবে।
এখন দেখার বিষয়, পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ পায় কি না, আর পেলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।
