ভারতের দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালুর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ক্যাম্পাসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
শনিবার (১৪ অক্টোবর) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অবস্থানস্থলে থাকা তাঁবু সরানোর উদ্যোগ নেন নিরাপত্তাকর্মীরা। ওই তাঁবুর নিচে কয়েকজন শিক্ষার্থী অনশন করছিলেন। তাঁবু সরানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে সংঘর্ষ বাধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মাহতাব আলম রিজভি এ পরিস্থিতির জন্য কংগ্রেসের দুই সংসদ সদস্যের ক্যাম্পাস সফরকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁদের সফরের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আন্দোলনকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ছাত্র সংসদ পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (জেএমআইএসইউ) পুনর্বহাল এবং নির্বাচিত ছাত্র সংসদ চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। ২০০৬ সালে ক্যাম্পাসে সহিংসতার কারণে শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পর ছাত্র সংসদটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল।
প্রায় দুই দশক ধরে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকার বিষয়টি সম্প্রতি রাজনৈতিক মহলেও আলোচনায় এসেছে। গত ২১ অক্টোবর ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দেওয়া এক চিঠিতে সিপিআই(এম) সংসদ সদস্য জন ব্রিটাস বিষয়টি তুলে ধরেন।
চিঠিতে তিনি শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার সাংবিধানিক অধিকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনা এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে লিংডোহ কমিটির সুপারিশের কথা উল্লেখ করেন।
কংগ্রেসের দুই সংসদ সদস্যকে ঘিরে বিতর্ক
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মাহতাব আলম রিজভির অভিযোগ, কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইমরান প্রতাপগড়ি ও ইমরান মাসুদ দেয়াল টপকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিলেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান রিজভি।
তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস সংসদ সদস্য ইমরান প্রতাপগড়ি। তাঁর অভিযোগ, অনশনরত শিক্ষার্থীদের তাঁবু জোর করে সরানোর চেষ্টা করে প্রশাসন আন্দোলনকারীদের ঐক্য দুর্বল করতে চেয়েছে।
প্রতাপগড়ি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সম্মান দেখানো। তাঁদের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের সমর্থনে প্রয়োজনে আবারও ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা জানান এই কংগ্রেস নেতা।
১২ অক্টোবর থেকে চলছে আন্দোলন
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গত ১২ অক্টোবর থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চলছে। কমিউনিস্টপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা) অভিযোগ করেছে, কোনো উসকানি ছাড়াই অনশনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ক্যাম্পাসের দেয়ালে ভারতবিরোধী স্লোগান লেখাকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্লোগানগুলো জম্মু ও কাশ্মীর-সংশ্লিষ্ট হওয়ায় ঘটনাটির তদন্ত দাবি করেছে বিজেপি।
তবে শিক্ষার্থী আবিন বাসিলের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ইন্ধনেই বিতর্কিত স্লোগানগুলো লেখা হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ওই স্লোগানের বিরোধিতা করেন এবং তাঁদের মূল দাবি হলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন।
বাসিলের আরও অভিযোগ, আন্দোলন প্রত্যাহার করাতে প্রশাসন বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করছে। শনিবার অধ্যাপক ও নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের আন্দোলনের তাঁবু খুলে সরানোর উদ্যোগ নেন বলেও দাবি করেন তিনি।
কংগ্রেসের দুই সংসদ সদস্যের সফর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বাসিল বলেন, তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তাঁদের ক্যাম্পাসে আসার কারণে পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কথা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান এবং রাজনৈতিক নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ক্যাম্পাসে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আন্দোলন ও সংঘর্ষের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যও সামনে এসেছে।
