ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভ্যাকসিন প্রযুক্তি। ত্বকের মারাত্মক ক্যানসার মেলানোমায় আক্রান্ত রোগীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় পরীক্ষামূলক ক্যানসার টিকা আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের পর প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে এই টিকা ব্যবহার করলে ক্যানসার ফিরে আসা কিংবা রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, সবার জন্য একই ধরনের টিকা ব্যবহারের পরিবর্তে প্রতিটি রোগীর টিউমারের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে আলাদাভাবে টিকা তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ শনাক্ত করতে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করা হয়।
সাধারণত প্রচলিত টিকা সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। তবে ক্যানসারের চিকিৎসায় তৈরি এই ধরনের ভ্যাকসিনের উদ্দেশ্য ভিন্ন। রোগীর শরীরে ইতিমধ্যে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর, বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পর, অবশিষ্ট ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
গবেষণায় ব্যবহৃত ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিকা রোগীর টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়। ক্যানসার কোষে থাকা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা অ্যান্টিজেন শনাক্ত করে এমন উপাদান নির্বাচন করা হয়, যা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ওই কোষগুলো চিনতে সহায়তা করে। এর ফলে শরীরের প্রতিরোধী কোষ ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানোর সুযোগ পায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১ হাজার ১৩৭ জন রোগীকে নিয়ে বড় পরিসরে এই চিকিৎসাপদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর প্রচলিত ক্যানসারের ওষুধের সঙ্গে পরীক্ষামূলক টিকা ব্যবহারে রোগের পুনরাবৃত্তি ও মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক রোগীর ক্যানসার ফিরে আসার আশঙ্কা ঠিক ৪২ শতাংশ কমে যাবে। এ ধরনের পরিসংখ্যান সাধারণত গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের দুই দলের তুলনামূলক ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাই গবেষণার নকশা, পর্যবেক্ষণের সময়কাল এবং কোন ধরনের ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়েছে, তা জানা প্রয়োজন।
মেলানোমা ত্বকের একটি গুরুতর ক্যানসার। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা সম্ভব হতে পারে। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার পরও ক্যানসার ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অস্ত্রোপচারের পর পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর নতুন পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসার ভ্যাকসিন এই ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রোগীর টিউমারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করার ধারণাটি ক্যানসারের চিকিৎসাকে আরও নির্দিষ্ট ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলতে পারে।
গবেষকদের আশা, মেলানোমার চিকিৎসায় এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা আরও গবেষণায় নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সব ধরনের ক্যানসারে এই প্রযুক্তি সমানভাবে কার্যকর হবে কি না, তা এখনো গবেষণার বিষয়।
সব মিলিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণার অগ্রগতি চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও প্রাথমিক ও পরীক্ষামূলক সাফল্যকে চূড়ান্ত নিরাময় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, তবু ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
