দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এসব ইস্যুতে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে দলটি। ওই দিন বিকেল ৩টায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকার কর্মসূচি শেষে দেশের অন্যান্য স্থানেও বিক্ষোভ আয়োজনের পরিকল্পনা জানিয়েছে দলটি।
কেন এই আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি, সে বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে লিফলেট বিতরণ ও পথসভায় অংশ নিয়ে তিনি সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়েনি এবং বাজেটের পরও বাড়বে না। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে দাঁড়িয়ে এমন বক্তব্য দিলে তা মানুষের সঙ্গে বিভ্রান্তিকর আচরণের শামিল। এ কারণে বর্তমান সরকারকে জনবিরোধী আখ্যা দেন তিনি এবং এর গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
কারওয়ান বাজার থেকে কর্মসূচি শুরুর কারণ
আন্দোলনের সূচনা হিসেবে কারওয়ান বাজারকে বেছে নেওয়ার পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে বলে জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর মতে, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র এই বাজার থেকে ঢাকাজুড়ে কাঁচামাল ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ হয়। অথচ এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগ উঠে আসছে।
নাহিদ ইসলামের দাবি, কয়েক মাস আগে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তাঁদের এলাকা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সন্ত্রাসী ও দখলদার সিন্ডিকেটের আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতেই এই বাজার থেকে প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছে এনসিপি।
তিনি জানান, আগামী ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ তুলে ধরা এবং সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে চারটি বিষয় বিশেষভাবে জনজীবনকে প্রভাবিত করছে। এগুলো হলো আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির বাড়তি দাম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।
তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও দমন-পীড়নের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাঁর অভিযোগ, গণমাধ্যম সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে গেলেও বিভিন্ন বাধার মুখে পড়ছে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ১৫ অক্টোবর নেত্রকোনায় একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং পরদিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আরেক সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ১৯ অক্টোবর কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়কে ৫০ থেকে ৬০টি যানবাহনে ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা হেলথ সেন্টারে ভাঙচুর এবং ইসিবি চত্বর এলাকায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও অপরাধের বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, গত নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১১৩ জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি তিনি আরও ১৮৭ জনের মৃত্যুর এবং ৬৩৭ জন নারীর ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই শিশু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসব পরিসংখ্যান ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই বক্তব্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যায়নি।
সাইবার আইন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সরকারের সমালোচনা কিংবা বিভিন্ন নীতির পর্যালোচনা করার কারণে নাগরিকদের যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাঁর অভিযোগ, সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া শেখ হাসিনার সরকারের সময়কার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের পরিবর্তে আরও দমনমূলক আইন প্রণয়নের চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি। এনসিপি এ ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা করবে বলে জানান দলটির আহ্বায়ক।
বাজারদর নিয়ে সরকারের সমালোচনা
কারওয়ান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, সেখানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ২০০ থেকে ২১০ টাকা, টমেটো ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর মতে, পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ পরিবারগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করতে পারছে না। অনেক মানুষ একসঙ্গে একাধিক ধরনের সবজি কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছেন। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকেও ডিমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য কেনার পরিমাণ কমাতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়েও সরকারের সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর এলপিজি গ্যাসের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে সরকারি হিসাবে তা বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। বেসরকারি বাজারে একই গ্যাসের দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে দাবি করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, অকটেন ও ডিজেলের দাম তিন দফায় বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখালেও সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা জানানো হয়নি।
তিনি বলেন, এনসিপি কেবল সরকারের সমালোচনা করার জন্য রাজপথে নামছে না; বরং অর্থনৈতিক চাপ ও বিভিন্ন সংকটে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তাও দিতে চায়। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দলটি ভবিষ্যতেও সক্রিয় থাকবে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, গত সাত মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের পদে থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, সংবিধানে এমন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে।
জ্বালানি খাতের সমস্যা মোকাবিলায় সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এর আগে তথ্য উপদেষ্টা ও একজন প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের অপসারণের কারণ স্পষ্ট করা হয়নি কেন। তাঁর অভিযোগ, যাঁদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না।
এনসিপির চার দফা দাবি কী?
৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভকে সামনে রেখে চারটি প্রধান দাবি তুলে ধরেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি।
প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, সাইবার আইন সংশোধনের নামে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত আইন ও মানবাধিকার কমিশন আইনসহ কর্তৃত্ববাদী বলে বিবেচিত আইনগুলো বাতিলের দাবি জানিয়েছে দলটি।
চতুর্থত, জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জুলাইয়ের শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের পরিবারের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে এনসিপি।
দলটির আহ্বায়ক জানান, আগামী ৩০ অক্টোবর বিকেল ৩টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করা হবে।
এ ছাড়া রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী দখলদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ প্রচার কার্যক্রম চালাবেন বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে এনসিপি। আগামী ৩০ অক্টোবরের কর্মসূচিতে কতটা জনসমাগম হয় এবং দলটির দাবির বিষয়ে সরকার কী প্রতিক্রিয়া জানায়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।
