বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। একই সঙ্গে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেওয়া এক বার্তায় হুমায়ুন কবির বলেন, বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রতি বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমান বিশ্বের জটিল সমস্যাগুলো সমাধানে জাতিসংঘের কার্যক্রমে অর্থবহ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সুসংহত করা, মানবাধিকার রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচিত হওয়া বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে সরকারের আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তাঁর মতে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘকে কার্যকর ভূমিকা পালনের উপযোগী করে তুলতে সংস্কার অপরিহার্য।
হুমায়ুন কবির আরও বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি জাতিসংঘ চায়, যেখানে বিশ্বের সব দেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে নিরাপত্তা পরিষদের অর্থবহ সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগকে সমর্থন করে ঢাকা। সমসাময়িক বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি সব রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকার কথাও বার্তায় উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাস্তব সহযোগিতা ও পারস্পরিক সংহতির ওপর ভিত্তি করে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর মতে, জাতিসংঘ দিবস বিশ্ব সংস্থাটির সনদের গুরুত্ব এবং অভিন্ন সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। বর্তমান সময়ে সংঘাত, মানবিক সংকট ও বৈষম্য মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে আরও দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন।
উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের বিস্তৃত অংশীদারত্ব রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। টেকসই উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে এই সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের ১২ লাখেরও বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, মানবিক বিবেচনা থেকেই বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক ও জোরালো সহযোগিতা প্রয়োজন। রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং টেকসইভাবে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বানও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগের পাশাপাশি উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বার্তার শেষাংশে হুমায়ুন কবির বিশ্বজুড়ে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং বিভেদ কমাতে দেশগুলোর প্রতি একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে।
জাতিসংঘ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কাছে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও জাতিসংঘের কার্যকর সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
