শারদীয় দুর্গাপূজা শেষ হলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। তবে ঢাকার ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী বণিক বাড়িতে প্রচলিত রয়েছে ভিন্ন এক রীতি। এখানে দেবী দুর্গার স্থায়ী প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। বরং দর্পণে প্রতীকী বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ করা হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। আর এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ৫২০ কেজি ওজনের বিশাল অষ্টধাতুর দুর্গা প্রতিমা।
প্রায় আট ফুট উচ্চতার এই প্রতিমাটি তৈরি করা হয় ২০১৭ সালে। এটি নির্মাণে সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর। তৎকালীন হিসাবে প্রতিমাটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২৫ লাখ টাকা। আট ধরনের ধাতুর সমন্বয়ে তৈরি হওয়ায় প্রতিমাটি যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বণিক পরিবারের দীর্ঘদিনের শিল্পঐতিহ্য।
প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতুগুলো হলো স্বর্ণ, রৌপ্য, পারদ, দস্তা, সীসা, লোহা, রাং ও তামা। দেবী দুর্গার পাশাপাশি এতে রয়েছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকের প্রতিমা। বাংলার প্রচলিত সনাতন রীতির অনুসরণে তৈরি হয়েছে প্রতিমার অবয়ব ও চোখের নকশা। বিশেষভাবে নজর কাড়ে বাঁশপাতার আদলে নির্মিত দেবীর চোখ।
বণিক বাড়ির স্বত্বাধিকারী সুকান্ত বণিকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রতিমা তৈরিতে বাইরের কারিগরের পরিবর্তে পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়েছেন। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে তাঁদের পরিবার তামা, কাঁসা ও পিতলের সামগ্রী তৈরির সঙ্গে যুক্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই ধাতুশিল্পের অভিজ্ঞতাই অষ্টধাতুর প্রতিমা নির্মাণে কাজে লেগেছে।
সুকান্ত বণিক জানান, আগে তাঁদের পরিবারে মাটির প্রতিমা তৈরি করে দুর্গাপূজা করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিবারের সদস্যসংখ্যা কমে আসায় স্থায়ী প্রতিমা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সেই ভাবনা থেকেই পরিবারের সদস্যরা মিলে অষ্টধাতুর দুর্গা প্রতিমাটি তৈরি করেন। এটি পারিবারিক পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির জন্য নয়। তবে আগ্রহী কেউ অর্ডার দিলে একই ধরনের প্রতিমা তৈরি করে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
বণিক বাড়িতে দুর্গাপূজা আয়োজনের ইতিহাস প্রায় ১২৬ বছরের। ২০১৭ সালে অষ্টধাতুর প্রতিমা নির্মাণের পর থেকে প্রতিবছর পূজার আগে সেটিকে নতুন করে সাজানো হয়। দুর্গাপূজার পাঁচ দিন বাড়ি ও পূজামণ্ডপ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। এ সময় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে প্রতিমা দর্শন করেন।
দর্শনার্থীদের আকর্ষণ কেবল বিশাল এই প্রতিমাকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়। বণিক বাড়ির পুরোনো স্থাপত্য, নান্দনিক কারুকাজ এবং কাঁসা-পিতলের তৈরি বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিও বাড়িটির ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। বাড়ির বিভিন্ন স্থানে রয়েছে নটরাজসহ নানা দেবদেবীর মূর্তি, যা ধাতুশিল্পের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
সুকান্ত বণিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও এই প্রতিমা দেখতে এসেছেন। অষ্টধাতুর দুর্গা প্রতিমাটি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
ধামরাইয়ের বণিক বাড়ির এই প্রতিমা একদিকে যেমন সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে এটি পরিবারের দীর্ঘদিনের ধাতুশিল্পের দক্ষতা ও ইতিহাসেরও পরিচায়ক। সাধারণ প্রতিমার মতো বিসর্জন না দিয়ে দর্পণে প্রতীকী বিদায়ের রীতি এই বাড়ির দুর্গাপূজাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
ধর্মীয় আচার, পারিবারিক ঐতিহ্য ও প্রাচীন কারুশিল্পের সমন্বয়ে ধামরাইয়ের বণিক বাড়ি এখন দুর্গাপূজার সময় দর্শনার্থীদের আগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র। ৫২০ কেজি ওজনের অষ্টধাতুর প্রতিমা এবং দর্পণ বিসর্জনের ব্যতিক্রমী আয়োজনের মধ্য দিয়ে টিকে রয়েছে তাঁদের দীর্ঘদিনের পূজার ঐতিহ্য।
