জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাল দিতে ইউরোপের অনেক পরিবার বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। এত দিন বাড়ির ছাদে সৌরপ্যানেল বসানোর প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন উঠান, বারান্দা, বেড়া এমনকি গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাতেও বসানো হচ্ছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা। লক্ষ্য একটাই—বিদ্যুৎ বিল কমানো এবং গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা।
ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারের জ্বালানির দামে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের জন্য সৌরবিদ্যুৎ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউরো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে পরিবারগুলো নিজেদের বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
সোলার পাওয়ার ইউরোপের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস আমদানি বাবদ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় হয়েছে বলে হিসাব করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যয় এখনো অনেক পরিবারের জন্য উদ্বেগের কারণ। এ কারণে সৌরপ্রযুক্তি স্থাপনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
জার্মানির নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এনপাল বিএ জানিয়েছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহে সৌরপ্যানেল স্থাপন সম্পর্কে গ্রাহকদের আগ্রহ ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইওএনের তথ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে আগ্রহ ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সপ্তাহে তা আরও ৬৩ শতাংশ বেড়ে যায়।
শুধু বাড়ির ছাদ নয়, বিকল্প জায়গায় সৌরপ্যানেল স্থাপনের প্রযুক্তিও তৈরি করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। হাঙ্গেরির কোম্পানি প্লাটিও উঠান, হাঁটার পথ ও গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় ব্যবহার করা যায়—এমন সৌরপ্যানেল তৈরি করছে। ২০১৬ সালে প্রথম নমুনা তৈরির পর প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের ১৩টি দেশে কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে বলে জানা গেছে।
২০১৮ সালে হাঙ্গেরির কেচকেমেট শহরের একটি বাড়ির গাড়ি রাখার জায়গায় নয় বর্গমিটার আয়তনের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। এর উৎপাদনক্ষমতা ছিল ১ দশমিক ৭ কিলোওয়াট-পিক। উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে ফ্রিজ, এলইডি বাতি এবং রান্নাঘরের ছোটখাটো বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো সম্ভব হতে পারে।
এ ছাড়া ২০২১ সালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছাকাছি ছয়টি ফ্ল্যাটবিশিষ্ট একটি ভবনের উঠানেও সৌরপ্যানেল বসানো হয়। যুক্তরাজ্যের সোলারপেভ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান বাড়ির গাড়ি রাখার জায়গা এবং বারান্দার মেঝেতে সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি স্থাপনের কাজ করছে।
এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, প্যানেলের ওপর শক্ত ও পিচ্ছিলরোধী কাচ ব্যবহার করা হয়। ফলে নির্দিষ্ট নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসারে এসব পৃষ্ঠের ওপর দিয়ে হাঁটা কিংবা গাড়ি পার্ক করা সম্ভব। অর্থাৎ, যে জায়গা আগে শুধু চলাচল বা গাড়ি রাখার কাজে ব্যবহৃত হতো, সেখান থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ছাদের ওপর সূর্যের দিকে নির্দিষ্ট কোণে বসানো সৌরপ্যানেলের তুলনায় সমতল মেঝেতে স্থাপন করা প্যানেল সাধারণত কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। ধুলাবালি জমলেও উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের খরচ বিবেচনা করতে হয়। ফলে বিনিয়োগের অর্থ কত বছরে উঠে আসবে, তা নির্ভর করে জায়গা, সূর্যালোক, বিদ্যুতের দাম ও ব্যবহারের ধরনের ওপর।
গ্লোবাল সোলার কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া ডানলপের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানির দামের ওঠানামা মানুষকে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করছে। তাঁর মতে, সৌরবিদ্যুৎ সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শুধু ছাদের ওপর নির্ভর করতে হয় না। কোনো বাড়ির ছাদ ছায়ায় ঢাকা থাকলে কিংবা সেখানে প্যানেল বসানোর উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে উঠান, বারান্দা, বেড়া ও গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাও বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
সব মিলিয়ে ইউরোপে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এখন প্রচলিত ছাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে নতুন নতুন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমানো, পরিবারের বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এর প্রকৃত আর্থিক সুবিধা নির্ভর করবে স্থানীয় পরিবেশ, স্থাপনের ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ওপর।
