সচ্ছল জীবনের আশায় ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ নজরুল ইসলাম মাহিন। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটিয়ে স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কারাবন্দি হন তিনি। দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসতেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার ও এলাকায়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে তাঁর পুরোনো ফেসবুক পোস্টগুলো, যেখানে উঠে এসেছিল মধ্যবিত্ত জীবনের চাপ, অর্থকষ্ট আর স্বপ্নের কথা।
২০২৩ সালের ৩ মে ফেসবুকে একটি পোস্টে নজরুল লিখেছিলেন, ‘চিন্তা কমাতেও চিন্তা করতে হয় মধ্যবিত্ত সন্তানদের।’ তাঁর সেই কথাগুলো এখন নতুন করে নাড়া দিচ্ছে অনেককে। যে তরুণ পরিবারের দুশ্চিন্তা কমানোর আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন, তাঁর নিজের জীবনই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে এক গভীর বেদনার গল্পে।
নজরুলের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে দেখা যায়, প্রবাসজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজের অনুভূতি, আশা এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তবতা নিয়ে নানা কথা লিখতেন। ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর দেশ ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে তোলা একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি বাংলাদেশকে বিদায় জানান। পোস্টে স্বজনদের কথা মনে পড়ার কথা উল্লেখ করে সবার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন।
সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর একই বছরের ২৯ নভেম্বর আরেকটি পোস্টে নিজের মধ্যবিত্ত পরিচয়ের কথা তুলে ধরেন তিনি। পরের বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘাসের ওপর শুয়ে থাকা একটি ছবি প্রকাশ করে অর্থের গুরুত্ব নিয়ে মন্তব্য করেন। এসব পোস্টে কখনো ছিল জীবনের বাস্তবতা, কখনো ছিল স্বপ্ন আর সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
প্রবাসজীবনের একপর্যায়ে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন নজরুল। ২০২৩ সালের ৮ মার্চ কাবা শরিফের সামনে নীল রঙের ইউনিফর্ম পরা নিজের একটি ছবি প্রকাশ করেন তিনি। ছবির সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ক্লিনার মক্কা হেরাম শরিফ।’ তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর সেই ছবিটি ঘিরেও অনেকে শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে মামলার বিস্তারিত, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ছিলেন চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার প্রত্যাশা ছিল তাঁর ওপর। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর খবর পরিবারটির জন্য একের পর এক দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে। স্বজনদের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শোনার পর ওই রাতেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ফুফু আবেদা বেগম।
নজরুলের মা রহিমা বেগমের অভিযোগ, কারাগারে থাকা অবস্থায় ছেলে প্রতি রোববার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকেই তাঁরা প্রথম ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে নজরুলের বাবা আব্দুল বাছিরের কণ্ঠে এখন হতাশা আর অসহায়ত্ব। তিনি জানান, সংসারের আর্থিক অবস্থা ভালো করার আশায় সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ছেলে কারাগারে চলে যাওয়ায় পরিবারের প্রত্যাশা ভেঙে পড়ে। কারাবন্দি হওয়ার আগে বা পরে নজরুল মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন বলে দাবি তাঁর বাবার।
ছেলেকে হারানোর শোকের পাশাপাশি এখনো ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে হচ্ছে পরিবারটিকে। নজরুল ঠিক কী পরিস্থিতিতে কারাগারে গিয়েছিলেন, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতেন না বলে আক্ষেপ করেছেন তাঁর বাবা। এখন তাঁর একমাত্র চাওয়া, ছেলের মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো নিজ মাটিতে দাফন করতে পারেন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সহায়তা, দূতাবাসের দায়িত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠকেরা। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে একজন বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশের কারাগারে থাকলে তাঁর মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স সোসাইটির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. সুজন সরকার এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বিচারসংক্রান্ত জটিলতায় কার্যকর সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নজরুলের ঘটনা দূতাবাসের ভূমিকা এবং প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক সংগঠক শামীম আহমেদও দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার পর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বিদেশে কোনো নাগরিক গুরুতর মামলায় আটক হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, মামলার তথ্য সংগ্রহ এবং পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানিয়েছেন, প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি এবং পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে আনা হলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নজরুলের মৃত্যুর ঘটনা এখন তাঁর পরিবারের কাছে শুধু একজন প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঋণের বোঝা, অনিশ্চয়তা এবং শেষবারের মতো ছেলের মরদেহ দেখার আকুতি। পাশাপাশি প্রবাসে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। এখন পরিবারের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
