শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মতিউর রহমান সাগরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সাংগঠনিক কার্যক্রমের বাইরে গিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনা, দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ বিএনপির সব পদ ও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সভাপতি সফিকুর রহমান কিরণ এবং সাধারণ সম্পাদক সরদার এ কে এম নাসির উদ্দিন কালুর নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ কামরুল হাসানের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়েছে।

সম্প্রতি নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেনকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসেন মতিউর রহমান সাগর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ওসিকে উদ্দেশ করে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বাহার যে পথে গেছে, আপনিও যাবেন সে পথে।’ এই বক্তব্য ঘিরেই ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় সোমবার বিকেলে নড়িয়া উপজেলার বাংলা বাজার এলাকায়। সেখানে নির্বাচনি বিলবোর্ড লাগানোকে কেন্দ্র করে সাগরের সঙ্গে জুলাই শহীদ মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের বাবা আবু তালেবের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি হাতাহাতিতে গড়ায়।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় সাগরের সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি অর্ণবের চাচা আব্দুস সালামকে মারধর করেন। পরে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘যুবলীগ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

মতিউর রহমান সাগরের দাবি ছিল, আব্দুস সালাম তার নির্বাচনি ব্যানার ছিঁড়ে আগুন দিয়ে নষ্ট করেছেন। এ অভিযোগে তাকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর দাবিও করেন তিনি।

তবে পুলিশ ঘটনাটি যাচাই করে আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অভিযোগের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ নিয়েই পুলিশের সঙ্গে মতিউর রহমান সাগরের বিরোধ তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে তিনি নড়িয়া থানার ওসির সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই মধ্যে ওই কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

বহিষ্কারাদেশে বিএনপি জানিয়েছে, মতিউর রহমান সাগরের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার দলীয় শৃঙ্খলা লঙ্ঘন, অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জড়ানো, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।

এসব অভিযোগের বিষয়ে গত ২৮ জুলাই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সতর্ক করার পরও তার বিরুদ্ধে নতুন করে একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

জেলা বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বারবার দলীয় নীতি ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কারণে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে মতিউর রহমান সাগরকে দলটির প্রাথমিক সদস্যপদসহ নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদ এবং অন্যান্য সব দলীয় দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বহিষ্কার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের একটি অনুলিপি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এবং ফরিদপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ এমপির কাছেও পাঠানো হয়েছে।

বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান মতিউর রহমান সাগর। সেখানে তিনি লেখেন, যে দলের জন্য জীবনের দীর্ঘ সময় ও যৌবন ব্যয় করেছেন, সেই দলই তাকে বহিষ্কার করেছে—আলহামদুলিল্লাহ।

এদিকে মতিউর রহমান সাগরের বিরুদ্ধে এর আগেও সাংবাদিকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পৃথকভাবে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও জানা গেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় অন্তত ছয়টি জিডি করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে একাধিক অভিযোগে আলোচনায় থাকা নড়িয়া উপজেলা বিএনপির এই নেতার বিরুদ্ধে এবার দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের আইনগত সত্যতা সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version