cপৃথিবীর আকাশে এবার যুক্ত হয়েছে এক অদ্ভুত মহাজাগতিক অতিথি। আমাদের চিরচেনা চাঁদের পাশাপাশি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণে সাময়িকভাবে আটকা পড়েছে ছোট্ট একটি মহাকাশ শিলা। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন ‘২০২৬ কিউকিউ৮’ বা 2026 QQ8। আকারে মাত্র ছয় ফুটের মতো এই শিলাটি আপাতত পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। তবে এটি স্থায়ী কোনো উপগ্রহ নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষের প্রভাবে থাকার পর ২০২৭ সালের শুরুতে আবার মহাশূন্যে নিজের পথে ফিরে যাবে।
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশ শিলাটিকে প্রথম শনাক্ত করা হয় গত ২০ আগস্ট। তবে এর কক্ষপথের হিসাব বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, বস্তুটি আরও কয়েক মাস আগেই পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মধ্যে চলে এসেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এপ্রিলের শেষ দিকে পৃথিবীর অস্থায়ী উপগ্রহে পরিণত হয় এটি।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত ছোট একটি পাথর কীভাবে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে শুরু করল?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে মহাকর্ষের এক বিশেষ প্রক্রিয়ায়। মহাকাশে অসংখ্য গ্রহাণু ও পাথুরে বস্তু সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এদের কোনোটি পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করার সময় আমাদের গ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাবের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। তখন বস্তুটি সাময়িকভাবে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে শুরু করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘টেম্পোরারি স্যাটেলাইট ক্যাপচার’। আর এমন অস্থায়ী উপগ্রহকেই সাধারণভাবে বলা হয় মিনি মুন।
গবেষকেরা কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্যে ২০২৬ কিউকিউ৮-এর গতিপথ বিশ্লেষণ করেছেন। এতে দেখা গেছে, শিলাটি সূর্যের চারপাশে একবার ঘুরতে প্রায় ৩৫৯ দিন সময় নেয়। অর্থাৎ এর কক্ষপথ পৃথিবীর এক বছরের সময়ের কাছাকাছি। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় প্রতি ১০ বছর পরপর এটি পৃথিবীর কাছাকাছি আসে। কিন্তু এবার তুলনামূলকভাবে এমন অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে পৃথিবীর মহাকর্ষ তাকে সাময়িকভাবে আটকে ফেলেছে।
মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর সঙ্গে অবস্থানকালে শিলাটির সবচেয়ে কাছের দূরত্ব ছিল প্রায় ৩ লাখ ৫৩ হাজার মাইল। অর্থাৎ আমাদের পরিচিত চাঁদের গড় দূরত্বের চেয়েও এটি অনেকটা দূরে অবস্থান করছে। তাই নাম শুনে আকাশে দ্বিতীয় একটি চাঁদ দেখা যাবে—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বস্তুটি এতটাই ছোট ও দূরবর্তী যে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। এটি শনাক্ত করতে প্রয়োজন শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি।
তবে পৃথিবীর জন্য কি কোনো বিপদের কারণ হতে পারে এই মহাকাশ শিলা?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আপাতত উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। বস্তুটির আকার আনুমানিক ছয় ফুটের মতো। কোনোভাবে এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলেও বায়ুর সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে জ্বলে ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই এটি পৃথিবীর জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করছে না।
এ ধরনের ঘটনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর আগেও পৃথিবী অল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন ছোট মহাকাশীয় বস্তুকে নিজের মহাকর্ষীয় প্রভাবে আটকে রেখেছে। ২০২০ এসও, ২০২০ সিডি৩ এবং ২০২৪ পিটি৫-এর মতো বস্তু নিয়েও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে গবেষণা হয়েছে।
গবেষণায় এমন ধারণাও পাওয়া গেছে, পৃথিবীর চারপাশে যেকোনো সময়ে একাধিক ক্ষুদ্র অস্থায়ী উপগ্রহ থাকতে পারে। কিছু মডেল অনুযায়ী, একই সময়ে প্রায় ছয়টি পর্যন্ত ছোট বস্তু পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবে সাময়িকভাবে অবস্থান করতে পারে। এদের অনেকের আকার খুবই ছোট হওয়ায় শনাক্ত করা কঠিন।
বিজ্ঞানীদের মডেলিংয়ে দেখা গেছে, এ ধরনের অস্থায়ী উপগ্রহের গড় আকার প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার হতে পারে এবং সাধারণত কয়েক মাসের মধ্যেই তারা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে যায়। তবে তুলনামূলক বড় কোনো বস্তু অনুকূল কক্ষপথে আটকা পড়লে সেটি আরও দীর্ঘ সময় পৃথিবীর সঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।
২০২৬ কিউকিউ৮-এর মতো বস্তু নিয়ে গবেষণা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, এসব ক্ষুদ্র গ্রহাণু সৌরজগতের প্রাথমিক গঠন ও মহাকাশীয় বস্তুর গতিপথ সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে। পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে বিজ্ঞানীরা এগুলোর গতিবিধি তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। এতে গ্রহাণুর আচরণ, মহাকর্ষীয় প্রভাব এবং পৃথিবীর কাছাকাছি মহাকাশীয় বস্তুর গতিপথ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই ক্ষুদ্র মহাজাগতিক অতিথি কিন্তু চিরদিনের জন্য পৃথিবীর সঙ্গী হচ্ছে না। ডিসেম্বরের শেষ দিকে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে গিয়ে ২০২৭ সালে আবার সূর্যকে কেন্দ্র করে নিজের কক্ষপথে চলতে থাকবে এটি।
অর্থাৎ আমাদের চাঁদের পাশে থাকা এই ছোট্ট অতিথির পৃথিবী ভ্রমণ হবে মাত্র কয়েক মাসের। তারপর আবার হারিয়ে যাবে মহাকাশের অসীম বিস্তারে।
বন্ধুরা, পৃথিবীর এত কাছেই যে এমন ক্ষুদ্র অস্থায়ী উপগ্রহ ঘুরে বেড়াতে পারে, তা কি আগে জানতেন? আপনার মতামত কমেন্টে জানান। মহাকাশ, বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের এমন আরও অজানা তথ্য জানতে চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে পাশে থাকুন। ধন্যবাদ।
