ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র দখলদার শক্তি হিসেবে অবস্থান নিতে পারে—এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। ট্রাম্পের এমন বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্লোরিডায় নাসার একটি স্থাপনা পরিদর্শন ও সেখানে বক্তব্য দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
ইরান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তার দাবি, গত অক্টোবরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিকেই প্রকৃত যুদ্ধ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতকে একইভাবে যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করতে চান না ট্রাম্প। তার বক্তব্য, কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চললেও এতে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। যদিও এই দাবি নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বড়জোর একজন দখলদার বলা যেতে পারে। এমনকি দেশটি ইরানে দখলদার হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার এই বক্তব্যের সুনির্দিষ্ট অর্থ ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এরপর হরমুজ প্রণালী নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখন ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শুধু তাই নয়, হরমুজ প্রণালী থেকে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তেল উত্তোলন করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় ইরান। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।
এদিকে, কেশম দ্বীপের কাছাকাছি মার্কিন সামরিক হামলার খবর নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন ট্রাম্প। প্রথমে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলতে না চাইলেও পরে সীমিত পরিসরে হামলার কথা স্বীকার করেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ছোটখাটো কিছু হামলা চালিয়ে থাকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, ইরানের সামরিক বাহিনী ওই এলাকায় একটি বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা তৈরি করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি ধ্বংস করে দেয়। তবে এই অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে কেশম দ্বীপে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনায় হামলার বিষয়টি নিয়েও বক্তব্য দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি তখনও ঘটনাটিকে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে সীমিত অভিযান হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি এবং জুনে শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ, এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ট্রাম্পের দখলদার হওয়ার মন্তব্য কি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য, নাকি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত? আর হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এ বিষয়ে আপনার মতামত কমেন্টে জানান। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক পরিস্থিতির সর্বশেষ বিশ্লেষণ পেতে চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে পাশে থাকুন। ধন্যবাদ।
