‘সাত’ যেন এখন ফুটবলের মাঠে নতুন এক আতঙ্কের নাম। একের পর এক ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে সাতবার করে বল পাঠানোর ঘটনা দেখা যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলো বার্সেলোনার নারী দল। আর তাদের শিকারও কোনো সাধারণ দল নয়—চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ।
রোববার সন্ধ্যায় স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যুতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে দাপুটে জয় পেয়েছে বার্সেলোনা। ম্যাচের পুরোটা সময়ই প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য ধরে রাখে কাতালান ক্লাবটি। শেষ পর্যন্ত রিয়ালের জালে সাতবার বল পাঠিয়ে মাঠ ছাড়ে তারা। এই ম্যাচে বার্সেলোনার হয়ে সবচেয়ে আলোচিত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন ক্লাউদিয়া পিনা। একাই চারটি গোল করেছেন তিনি।
এই জয়ের ফলে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে বার্সেলোনা নারী দলের সবচেয়ে বড় জয় হিসেবে ম্যাচটি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। একই সঙ্গে লিগ টেবিলেও নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে বার্সেলোনা। জয় পাওয়ার পর তাদের পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ১৮-তে। অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের সংগ্রহ ১৩ পয়েন্ট। দুই দলের মধ্যে ব্যবধান এখন পাঁচ পয়েন্ট।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, বার্সেলোনা কোনোভাবেই রিয়ালকে স্বস্তিতে থাকতে দেবে না। নিজেদের অর্ধে রিয়ালকে আটকে রেখে উচ্চচাপে খেলতে থাকে বার্সার মেয়েরা। বল দখল, পাসিং এবং নিজেদের রক্ষণ থেকে আক্রমণে ওঠার ক্ষেত্রে তাদের সমন্বয় ছিল বেশ কার্যকর। ম্যাচ শুরুর মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই সেই চাপের ফলও পেয়ে যায় তারা।
প্রথম গোলটি করেন ক্লাউদিয়া পিনা। বক্সের প্রান্তে বল পাওয়ার পর দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়েন তিনি। রিয়ালের রক্ষণভাগ সেই মুহূর্তে যথেষ্ট নিষ্ক্রিয় থাকায় পিনা সুযোগ পেয়ে যান। এরপর বাঁ পায়ের শটে গোলরক্ষক ফ্রোমসকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান তিনি। খুব দ্রুতই এগিয়ে যায় বার্সেলোনা।
এর কিছুক্ষণ পর ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুযোগও তৈরি হয়। গিহারোর কাছ থেকে পাওয়া একটি শট কাছ থেকে ঠেকিয়ে রিয়ালকে তখন বিপদ থেকে রক্ষা করেন ক্রিস্তোবাল। সেই মুহূর্তে গ্যালারির দর্শকদের অনেকেই গোল ধরে নিয়ে উল্লাস শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিয়াল দ্বিতীয় গোল হজম করা থেকে বেঁচে যায়।
তবে ম্যাচে ফেরার মতো কার্যকর কোনো পরিকল্পনা রিয়াল মাদ্রিদ বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেনি। তাদের আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় শ্রোডার ও কাইসেদোও পুরো ম্যাচে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পাননি। অন্যদিকে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে কখনো ধীরগতির পাসিং, আবার কখনো দ্রুত পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে বার্সেলোনা।
এরপর আসে দ্বিতীয় গোল। দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে সুযোগ তৈরি করে বার্সেলোনা। বাইয়োরের নেওয়া প্রথম শট প্রতিহত হলেও ফিরতি বলটি পেয়ে যান পিনা। কোনো ভুল না করে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবারও রিয়ালের জালে বল পাঠান তিনি। এতে বার্সেলোনার ব্যবধান আরও বাড়ে।
পিনা তখন যেন থামার কোনো নামই নিচ্ছিলেন না। গিহারোর সঙ্গে চমৎকার ওয়ান-টু পাসের পর আবারও রিয়ালের রক্ষণভাগ ভেঙে ফেলেন তিনি। এরপর ডান পায়ের শক্তিশালী শটে ফ্রোমসকে পরাস্ত করে নিজের তৃতীয় গোলটি করেন। একই সঙ্গে পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক।
বার্সেলোনার আক্রমণের ধার তখনও কমেনি। চতুর্থ গোলের জন্য এবার স্কোরশিটে নাম লেখান গ্রাহাম। বাইয়োরের সঙ্গে পাস বিনিময়ের মাধ্যমে এগিয়ে গিয়ে লাকরারকে পাশ কাটিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করেন তিনি। এরপর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল পাঠান রিয়ালের জালে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন পুরোপুরিই বার্সেলোনার হাতে।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই রিয়ালের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলেন পিনা। এটি ছিল ম্যাচে তার চতুর্থ গোল এবং বার্সেলোনার পঞ্চম গোল। আবারও বাইয়োরের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়া তৈরি করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ফাঁক খুঁজে নেন তিনি। এক টাচে রিয়ালের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বল জালে পাঠিয়ে নিজের ব্যক্তিগত গোলসংখ্যা চার করেন পিনা।
পাঁচ গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য রিয়ালের সামনে ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ম্যাচের চিত্রে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং বার্সেলোনাই আক্রমণের গতি ধরে রাখে এবং আরও গোলের সন্ধান করতে থাকে।
দ্বিতীয়ার্ধে গিহারোর একটি লম্বা পাস থেকে আবারও আক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়। বল নিয়ে গোলের কাছাকাছি পৌঁছে যান গ্রাহাম। এরপর নিয়ন্ত্রণে থাকা বলটি বাইয়োরের জন্য সাজিয়ে দেন তিনি। সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাইয়োর করেন বার্সেলোনার ষষ্ঠ গোল।
এরপরও বার্সেলোনার আক্রমণ থামেনি। শেষ পর্যন্ত সপ্তম গোলের দেখা পায় তারা শের্টেনলাইবের মাধ্যমে। বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের দুর্দান্ত এক শটে তিনি রিয়ালের গোলরক্ষক ফ্রোমসকে পরাস্ত করেন। বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয় বার্সেলোনার সাত গোলের উৎসব।
শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদ আর ম্যাচে ফেরার কোনো পথ খুঁজে পায়নি। অন্যদিকে বার্সেলোনা পুরো ম্যাচজুড়ে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখে তুলে নেয় বিশাল ব্যবধানের জয়। বিশেষ করে ক্লাউদিয়া পিনার চার গোলের পারফরম্যান্স এই ম্যাচকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।
এই জয়ের ফলে লিগে বার্সেলোনার অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। ১৮ পয়েন্ট নিয়ে তারা উঠে গেছে টেবিলের শীর্ষে। বিপরীতে রিয়াল মাদ্রিদ ১৩ পয়েন্ট নিয়ে পাঁচ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে।
তবে এই বড় জয়ের পরও বার্সেলোনার সামনে এখন দ্রুত পরবর্তী ম্যাচের প্রস্তুতি। আগামী ১৮ অক্টোবর তারা মুখোমুখি হবে রিয়াল সোসিয়েদাদের। একই দিনে রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ হবে এস্পানিওল। ফলে সাত গোলের এই বিশাল পরাজয়ের পর রিয়াল মাদ্রিদ কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটিও এখন দেখার বিষয়।
