চীনের কিশোরদের মধ্যে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হংকং পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শিমিন ঝুর মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে কঠিন প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তন এবং দ্রুত সামাজিক রূপান্তর কিশোরদের মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চেন নামের এক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার কঠোর বাস্তবতা। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ৭টা ২০ মিনিটে পড়াশোনা শুরু করে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হতো। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কোচিং ক্লাসে অংশ নিতে হতো তাঁকে।
চীনে বাধ্যতামূলক শিক্ষার পরিসর নবম শ্রেণি পর্যন্ত। এরপর শিক্ষার্থীদের সাধারণ উচ্চ মাধ্যমিক অথবা কারিগরি শিক্ষার যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হয়। অঞ্চলভেদে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সাধারণ উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সুযোগ পায়। দেশটিতে সাধারণ শিক্ষার সামাজিক মর্যাদা বেশি হওয়ায় অনেক পরিবার কারিগরি শিক্ষাকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করে না।
শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট আরও গভীর হওয়ার পেছনে পরিবারের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চেনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর মা-বাবা কর্মব্যস্ত থাকায় তাঁর মানসিক কষ্ট যথাযথভাবে বুঝতে পারেননি। একপর্যায়ে তিনি নিজের শরীরে স্ট্যাপল দিয়ে আঁচড় কেটে আত্মক্ষতি করেন।
এর পাশাপাশি ডিজিটাল বিনোদনের অতিরিক্ত ব্যবহারও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভিডিও গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনোদনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করায় কিশোরদের শারীরিক কর্মকাণ্ড ও সরাসরি মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ কমছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে বাস্তব জীবনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনা সরকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাউন্সেলর নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্টেট কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চীনের ৯২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৯৫ শতাংশ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাউন্সেলর রয়েছেন। তবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ, পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং কাউন্সেলিংয়ের উচ্চ ব্যয় এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়েছে।
২০১৯ সালে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল, সে সময় চীনে শিশু ও কিশোরদের চিকিৎসার জন্য যোগ্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ছিল মাত্র প্রায় ৫০০।
বিশেষজ্ঞ শিমিন ঝু মনে করেন, কিশোরদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে শুধু পড়াশোনার চাপ কমালেই চলবে না। একই সঙ্গে তাদের হতাশা, ব্যর্থতা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মানসিক শক্তিও তৈরি করতে হবে। কোনো একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল করলেই যেন শিক্ষার্থীরা জীবনকে ব্যর্থ মনে না করে—এমন ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
