ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এই নেত্রী কয়েকবারই জানিয়েছেন, দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তিনি অটল। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নানা অনিশ্চয়তা রয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঝুঁকির কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি দেশে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী মহাসড়কে যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে।
এমন আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রযুক্তির সহায়তায় কুমিল্লাজুড়ে নজরদারি ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। এরই মধ্যে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ প্রায় ১০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। সড়কটি অচল হয়ে পড়লে পণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে আরও বলা হয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশনা ও অর্থায়নে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ কয়েকটি সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
নিরাপত্তাঝুঁকির বিবেচনায় মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ১৪টি স্থানকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। পয়েন্টগুলো হলো—দাউদকান্দি উপজেলার শহীদনগর, ইলিয়টগঞ্জ, পুটিয়া, তীরচর ও গোমতা; চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া ও কাঠেরপুল; বুড়িচং উপজেলার নিমসার ও কাবিলা; আদর্শ সদর উপজেলার সৈয়দপুর, আলেখারচর ও কোটবাড়ী; সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব এলাকার তুলনামূলক নির্জন স্থানে রাতের বেলায় দূরপাল্লার যানবাহনে ককটেল নিক্ষেপ, ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের চেষ্টা হতে পারে। তবে এসব পরিকল্পনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মহাসড়ককেন্দ্রিক সম্ভাব্য নাশকতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। এসব তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ জানান, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর মহাসড়কে নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোপন নজরদারির মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, নাশকতার পরিকল্পনা পুরোপুরি প্রতিরোধ না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মঞ্জুর মোর্শেদ জানান, মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশও সতর্ক রয়েছে। চিহ্নিত ১৪টি স্থানসহ পুরো ১০৩ কিলোমিটার এলাকায় দিন-রাত টহল ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। যানবাহন ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে না। বিচ্ছিন্ন মিছিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা থাকলেও দলটির সাংগঠনিক অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ একাধিকবার আবেদন করেছে। তবে এখনো ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসেনি। চুক্তিতে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। সাবেক কয়েকজন কূটনীতিকের ধারণা, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের আগ্রহ সীমিত।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস নেওয়ার বিষয়টিও সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তবে এমন আবেদন করা হলে সরকার সেটি অনুমোদন করবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিষয়টি আইনগত ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শেখ হাসিনা তাঁর পরিবার, ভারতের সংশ্লিষ্ট মহল এবং দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ মনে করেন, দেশে ফেরার প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর বিকল্প পরিকল্পনাও রয়েছে।
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বক্তব্য অনুযায়ী, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অনড় শেখ হাসিনা।
সব মিলিয়ে ডিসেম্বর ঘিরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কুমিল্লাসহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তি সতর্কতা ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
