কক্সবাজারে চলন্ত গাড়ির গতিরোধ করে এক ব্যবসায়ীকে লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে জুমার নামাজের আগে সদর উপজেলার খরুলিয়া এলাকায় রশিদ মেম্বারের গ্যাস পাম্পের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
গুলিবিদ্ধ ব্যবসায়ীর নাম মাহমুদুল হক। তাঁর বয়স ৪৫ বছর। তিনি কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের লিংকরোড বিসিক এলাকার বাসিন্দা আশরাফুজ্জামানের ছেলে। বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে শহরের হাশেমিয়া মাদ্রাসা এলাকায় বসবাস করেন তিনি। স্থানীয়ভাবে জমি কেনাবেচার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মাহমুদুল।
ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর প্রথমে তাঁকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাহমুদুল হক জানান, শুক্রবার দুপুরে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে রামুর দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। পথে খরুলিয়া এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে থাকা ছয় ব্যক্তি তাঁর গাড়ির সামনে এসে পথ আটকে দেন।
বিপদের আশঙ্কা বুঝতে পেরে গাড়ি থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু হামলাকারীরা পিছু নিয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। এতে তাঁর পিঠ ও কোমরসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলি লাগে। একটি গুলি এখনো শরীরের ভেতরে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই হামলার পেছনে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আহত ব্যবসায়ী। তাঁর দাবি, ঝিলংজা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলীর সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ ঘটনার সঙ্গে লিয়াকতের ভাই জায়েদ, কিতাব আলী ও ওয়াজেদ আলী এবং তাঁদের সহযোগী নাসেরসহ ছয়জন জড়িত।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের পরিবার ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলির শব্দে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে লোকজন ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। এরপর স্থানীয়রা আহত মাহমুদুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, হামলায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৪ মে কক্সবাজার আদালত চত্বরে গুলিবর্ষণের একটি ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় একজন আহত হন। পরে এ নিয়ে দুটি মামলা হয় এবং বিএনপি নেতা লিয়াকত আলী একটি মামলায় কারাগারে যান। সেই ঘটনার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে গত ১ নভেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঝিলংজা ইউনিয়নের মুন্সিপাড়া এলাকায় মোহাম্মদ সাঈদ নামে এক বিকাশ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তাঁর কাছ থেকে প্রায় ২২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
শুক্রবারের গুলির ঘটনায় অভিযুক্ত লিয়াকত আলীর পরিবারের বক্তব্যও পাওয়া গেছে। তাঁর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া জেসমিন আকতার জানান, লিয়াকত বর্তমানে আদালত চত্বরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় করা মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
মাহমুদুলের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, দুই পরিবার আত্মীয় হলেও তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। তাঁর দাবি, মাহমুদুলের পরিবারের লোকজন আগে থেকেই লিয়াকতকে হত্যার চেষ্টা করে আসছেন।
জেসমিন আকতার আরও দাবি করেন, ঘটনার সময় অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা ওয়াজেদ ও কিতাব আলী বাড়িতে ছিলেন এবং তাঁদের কাছে এ-সংক্রান্ত সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। প্রশাসন চাইলে সেই ফুটেজ দেখানো হবে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া জায়েদ আলী আদালত চত্বরে গুলির মামলায় আসামি হওয়ার পর থেকে এলাকার বাইরে রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, পুরোনো মামলার বিরোধ থেকেই মাহমুদুলের ওপর হামলার ঘটনায় লিয়াকতের পরিবারকে জড়ানো হচ্ছে।
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে জেসমিন বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।
এখন পর্যন্ত হামলার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ব্যবসায়ীর অভিযোগ, অভিযুক্ত পরিবারের পাল্টা বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্ত—সব মিলিয়ে কক্সবাজারের এই গুলির ঘটনা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
