দেশের জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ব্যক্তিগত বাসভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং শিল্পকারখানায় সৌর প্যানেল স্থাপনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর একটি সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘লিডিং বাই এক্সাম্পল: স্কেলিং রুফটপ সোলার ইন পাবলিক সেক্টর’।
মাহদী আমিন জানান, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের নতুন কোনো চিন্তা নয়। বিরোধী দলে থাকার সময়ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সৌরবিদ্যুতের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের প্রতিফলন হিসেবে তাঁর নিজ বাসভবনের ছাদেও সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়ে বড় পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়—সব পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানকে এই উদ্যোগের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদ ও অব্যবহৃত জায়গা চিহ্নিত করে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের ৫০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করতে চায় না সরকার। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে সরকার। বিনিয়োগ, অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাহদী আমিন বলেন, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত সৌর প্যানেলের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। এই নির্ভরতা কমাতে স্থানীয় উৎপাদন, যন্ত্রাংশ তৈরি এবং সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে যুক্ত দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করতে বাজেটেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই খাতের সম্প্রসারণের ফলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। এজন্য কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সৌর প্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সেবার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাড়ি, শিল্পকারখানা, হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, দেশের প্রতিটি খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—উভয় পর্যায় থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরির কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, সৌরবিদ্যুতের কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণ ঘটাতে সরকারের নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব।
সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুল হকসহ সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী ও সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
