এইচএসসি পরীক্ষায় হতাশাজনক ফলাফলের পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এবং কলেজের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে চট্টগ্রামের রাউজানের ইমাম গাজ্জালী ডিগ্রি কলেজ। এখন থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাটন ফোন ছাড়া কোনো স্মার্টফোন নিয়ে কলেজে প্রবেশ করতে পারবে না। একই সঙ্গে নির্ধারিত পোশাক ও পরিচয়পত্র ছাড়া ক্যাম্পাসে প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) থেকে নতুন এসব নিয়ম কার্যকর হয়েছে। এর আগে সোমবার কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবদুল জব্বার চৌধুরীর স্বাক্ষরে একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরে বিজ্ঞপ্তিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো শিক্ষার্থীর কাছে স্মার্টফোন পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাটন ফোন ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে কলেজে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
কলেজটির এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বেশ উদ্বেগজনক। মোট ৩৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ৮২ জন। সে হিসাবে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। উত্তীর্ণদের মধ্যে কেউ জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেননি। রাউজান উপজেলার ১৩টি কলেজের মধ্যে ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান হয়েছে ১২তম।
এমন ফলাফলের পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের ধারণা, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করার অন্যতম কারণ।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল জব্বার চৌধুরী জানান, অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে মনোযোগ না দিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সময় কাটায়। স্মার্টফোন পড়াশোনা ও তথ্য সংগ্রহের কাজে সহায়ক হলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করছে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে এইচএসসি পর্যায় পর্যন্ত এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদের স্মার্টফোন ব্যবহারে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন অধ্যক্ষ।
তিনি আরও জানান, গত সোমবার একাদশ শ্রেণির ক্লাস চলাকালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২৫টি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছে প্রয়োজনীয় বই না থাকলেও তাদের হাতে ছিল দামি স্মার্টফোন। শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনার পরিবর্তে তারা মোবাইল ফোন ব্যবহারে বেশি ব্যস্ত ছিল।
অধ্যক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, জব্দ করা ফোনগুলো শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বই নিয়ে ক্লাসে আসা শুরু করলে তাদের অভিভাবকদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। তবে ফোনগুলো ফেরত দেওয়ার বিষয়ে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতাও তাঁকে ফোন করেছিলেন বলে জানান তিনি।
শুধু স্মার্টফোনের ব্যবহার নয়, এইচএসসি পরীক্ষায় খারাপ ফলের পেছনে নির্বাচনী পরীক্ষার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করাকেও দায়ী করেছেন অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মূল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চাপের কারণে কয়েক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীসহ অনেককে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এ ধরনের চাপ থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কলেজের নতুন নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের পোশাকের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। ছাত্রদের সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরতে হবে। ছাত্রীদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সাদা থ্রি-কোয়ার্টার অ্যাপ্রোন, সাদা সালোয়ার-কামিজ এবং সাদা ওড়না। তবে বোরকা পরা ছাত্রীদের ক্ষেত্রে ইউনিফর্মের শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
এ ছাড়া একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বুধবার (৪ নভেম্বর) এসএসসি পরীক্ষার মূল নম্বরপত্র কলেজ অফিসে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কলেজের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেক অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক। অ্যাডভোকেট ফরহাদ উদ্দিন মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোনের ব্যবহার সীমিত করা হলে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত আসক্তি ও অপব্যবহার কমতে পারে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পরিবারের সচেতনতা এবং অভিভাবকদের নিয়মিত নজরদারিও প্রয়োজন।
তিনি বলেন, স্মার্টফোন থাকা নিজেই সমস্যা নয়; বরং এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাই মূল উদ্বেগের বিষয়। প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে শিক্ষার্থীদের ফোন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না করে এর সঠিক ব্যবহার, সময়সীমা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা জরুরি।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইমাম গাজ্জালী ডিগ্রি কলেজটি রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থিত। দীর্ঘদিনের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক ফলাফল নতুন করে শিক্ষার মান ও পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি পাঠদানের মান বাড়ানো, শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করাও জরুরি। এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হতে পারে।
