র্যাবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অভিযানে ১০৩ জনকে হত্যার অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। র্যাব-৮-এর আর্কাইভ থেকে সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চলাচলের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেও সফল হননি বলে আদালতে জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার সময় তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম এসব তথ্য তুলে ধরেন। বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মামলাটির কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও হত্যার অভিযোগে দায়ের করা এ মামলায় জিয়াউল আহসান একমাত্র আসামি। এদিন পঞ্চম দিনের মতো তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন তাঁর আইনজীবী সাহিদুর রহমান। মামলায় প্রসিকিউশনের ১৫তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিচ্ছেন রফিকুল ইসলাম। নিরাপত্তাজনিত কারণে আসামিকে কারাগারে রেখেই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
জেরার সময় বিভিন্ন অভিযানের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চান আসামিপক্ষের আইনজীবী। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি অভিযানের নির্বাহী তদন্ত প্রতিবেদন তিনি সংগ্রহ করেছেন। তবে সেসব প্রতিবেদনে জিয়াউল আহসানের নাম উল্লেখ ছিল না। তদন্ত কর্মকর্তা এসব প্রতিবেদনকে ‘ফরমায়েশি’ বলে অভিহিত করেন।
অভিযানের প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হতো কি না, এমন প্রশ্নে রফিকুল ইসলাম বলেন, নিয়ম মেনে পরিচালিত অভিযানের প্রতিবেদন সাধারণত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হতো। তবে অনিয়মের মাধ্যমে পরিচালিত অভিযানের প্রতিবেদন পাঠানো হতো না বলে তিনি দাবি করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মামলার তদন্তের প্রয়োজনে তিনি র্যাব-৮-এর কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে বিভিন্ন অভিযানের সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল নথিপত্র এবং জিয়াউল আহসান ও গোয়েন্দা শাখার সদস্যদের চলাচলসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো হাতে পাননি।
এ ছাড়া অভিযানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট র্যাব সদস্যদের নাম সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে যাওয়ার কথাও জানান তিনি। তবে এসব তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে কোনো লিখিত চাহিদাপত্র দেননি বলে জেরায় স্বীকার করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, তদন্ত কর্মকর্তা র্যাব-৮-এর কার্যালয় কিংবা র্যাব সদর দপ্তরে যাননি। তবে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনজীবীর বক্তব্য সঠিক নয়।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। জবানবন্দিতে তিনি তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন, তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ এবং সেগুলোর সঙ্গে মামলার অভিযোগের সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য দেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি ঘটনায় মোট ১০৩ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুরের পুবাইলে সড়কের পাশে সজলসহ তিনজনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতির অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
দ্বিতীয় অভিযোগে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী খালসংলগ্ন বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ও মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগে একই সময়কালে বরগুনার বলেশ্বর নদী এবং বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় কথিত বনদস্যু দমন অভিযানের আড়ালে মাসুদসহ আরও ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশন ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ওই দিনই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগগুলো আমলে নেন। পরে ২৩ ডিসেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আদালতে উত্থাপিত অভিযোগ ও বক্তব্যের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন ট্রাইব্যুনাল।
