রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিটটির বি-২ পর্যায়ের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ হয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই শুরু হবে পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোলে আগামী ২৫ অক্টোবরের দিকে পরীক্ষামূলকভাবে পাওয়ার স্টার্টআপ শুরু হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে ইউনিটটি ‘সি স্টেজ’ বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এর মধ্য দিয়ে রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে আরও এক ধাপ অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে রূপপুর প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশ সফরে আসা রাশিয়ার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বৃহস্পতিবার রাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকীর মাহবুব আনামের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা প্রথম ইউনিটের রিয়্যাক্টরের ক্রিটিক্যাল পর্যায়সহ বিভিন্ন কারিগরি কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করেন। শুক্রবার ঢাকায় অবস্থিত রাশিয়ার দূতাবাসের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের প্রথম উপমহাপরিচালক এবং প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেই পেত্রোভের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি ২০ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত রূপপুর প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করে। সফরের অংশ হিসেবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা এবং নির্মাণকাজের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করা হয়।
প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, বি-২ পর্যায়ের জটিল কারিগরি পরীক্ষা এবং ফিজিক্স টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন বুধবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিনিধিদলও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে প্রথম ইউনিটের ক্রিটিক্যাল পর্যায়ের অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরেছে।
এখন পরবর্তী কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অপেক্ষা চলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র পাওয়া গেলে প্রথম ইউনিটকে ‘সি স্টেজে’ উন্নীত করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে শুরু হবে পাওয়ার স্টার্টআপের কার্যক্রম। এই ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাওয়ার স্টার্টআপের শুরুতেই কেন্দ্রটির পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করা হবে না। বরং প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। প্রতিটি ধাপে পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও কারিগরি শর্ত পূরণ হলে ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ানো হবে।
কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, প্রথম ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ধাপে ধাপে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যক্রম শুরু করা যাবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে চলতি বছরের শেষ নাগাদ রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রাথমিকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন নির্ভর করছে পাওয়ার স্টার্টআপের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার ওপর। পরীক্ষার ফলাফল, কারিগরি মূল্যায়ন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ নিশ্চিত হওয়ার পরই পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ফিজিক্স টেস্ট ও বি-২ পর্যায়ের পরীক্ষা শেষ হওয়াকে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অনুমোদন পাওয়া গেলে পাওয়ার স্টার্টআপের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
