বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় অর্থনীতিতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে উঠছে। এর মধ্যে সরকারি ঋণের মোট পরিমাণের হিসাবে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশের সমান। বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপির ৪০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ঋণ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশের সরকারকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
সরকারি ঋণে শীর্ষ পাঁচ দেশ
সরকারি ঋণের মোট পরিমাণের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে চীন। দেশটির সরকারি ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৯৯ শতাংশ, যা বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০২ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১১৮ শতাংশ।
এ ছাড়া ইতালির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার সরকারি ঋণ নিয়ে ভারত রয়েছে তালিকার সপ্তম স্থানে। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৮৩ শতাংশ।
দেড় দশকে বাংলাদেশের ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ
বৈশ্বিক সরকারি ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম হলেও গত দেড় দশকে দেশের ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আইএমএফের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে।
অর্থাৎ, প্রায় ১৫ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে।
তবে ঋণ-জিডিপি অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় অর্থনীতির তুলনায় নিচে। বাংলাদেশের এই অনুপাত ৪০ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ১২৭ শতাংশ, ফ্রান্সের ১১৮ শতাংশ এবং ইতালির ১৩৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বন্ড বিক্রি করে যেভাবে ঋণ নেয় সরকার
সরকারি ব্যয় মেটানো ও বাজেটের ঘাটতি পূরণের জন্য বিভিন্ন দেশ সাধারণত বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহ করে। বিনিয়োগকারীরা এসব বন্ড কিনে সরকারকে অর্থ দেন। বিনিময়ে তাঁরা নির্দিষ্ট হারে সুদ পান এবং বন্ডের মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকারী হন।
উদাহরণ হিসেবে, ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী মেয়াদ শেষে মূল অর্থ পরিশোধ করা হয়। এসব বন্ডের ইল্ড বা ফলন সরকার কত খরচে ঋণ নিতে পারছে এবং বিনিয়োগকারীরা দেশটির অর্থনীতির ওপর কতটা আস্থা রাখছেন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সাধারণত বন্ডের বাজারমূল্য কমলে এর ইল্ড বেড়ে যায়। এর ফলে নতুন করে ঋণ নেওয়ার সময় সরকারকে বেশি সুদ দিতে হতে পারে। ঋণের সুদ পরিশোধে বাড়তি অর্থ ব্যয় হলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়ে। তখন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে বরাদ্দ কমানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফ্রান্সে ঋণের সুদ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ইউরোপের অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটিকে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ইতালি ও গ্রিসের তুলনায়ও ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ বেশি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর আগে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগাল আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছিল।
বর্তমানে ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট এবং সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ ঘিরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এসব ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছিলেন।
বৈশ্বিক ঋণ ছাড়িয়েছে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার
শুধু সরকারি খাত নয়, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে মোট ঋণ বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। গত জুনের শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
এই হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার হিসাবে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। আইআইএফ জানিয়েছে, বৈশ্বিক ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে।
ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
এই ব্যয়ের পরিমাণ বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতে ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চেয়েও বেশি।
ঋণের চাপ শেষ পর্যন্ত পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ওপর
সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়ে গেলে জনসেবামূলক খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো, নতুন ঋণ নেওয়া কিংবা বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
এ ছাড়া সরকারের ঋণ সংগ্রহের খরচ বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের সুদের হার বাড়তে পারে। এতে বাড়ি কেনার বন্ধকি ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপ এবং জনসেবার সুযোগ কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো যখন ক্রমবর্ধমান ঋণ ও সুদের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
