২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে প্রজ্ঞার ধারণা বোঝাতে মানুষের মস্তিষ্কের বদলে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বইটির প্রতীক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে বইটির মুদ্রণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি যেসব বই ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে গেছে, সেগুলো ফিরিয়ে এনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুনরায় বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বই ছাপানো ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, মুদ্রণ, বাঁধাই এবং বিতরণের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এখন সরবরাহ করা বই ফেরত এনে সংশোধন করতে গেলে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও বেশি লাগবে। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন বই পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
এনসিটিবির বই ছাপানোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণির বই মুদ্রণের কাজে ধীরগতি রয়েছে। এর মধ্যে বিতরণ করা বই সংগ্রহ, সংশোধন এবং পুনরায় সরবরাহের প্রক্রিয়া যুক্ত হলে সময়ের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক মো. রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে পাঠানো বইগুলো ফিরিয়ে এনে প্রতীকটি সংশোধন করা হবে। এরপর সেগুলো আবার শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ জন্য আপাতত মুদ্রণকাজ স্থগিত রাখার পাশাপাশি সরবরাহ করা বই সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেন কোনো ভুল তথ্য না পায়, তা নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য।
এনসিটিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দাঁড়িপাল্লা বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবইয়ে প্রতীকটির ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বইয়ের কোন অংশে রয়েছে দাঁড়িপাল্লার ছবি?
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডের মাধ্যমে উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। পিরামিডে নিচ থেকে ওপরের দিকে এই চারটি ধাপ সাজানো হয়েছে। প্রতিটি ধাপ বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পৃথক প্রতীক।
প্রথম ধাপে উপাত্ত বোঝাতে রয়েছে পাই চার্ট বা ঘড়ির মতো দেখতে একটি গোলাকার চিহ্ন। পরের ধাপে তথ্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে পরমাণু কিংবা নেটওয়ার্কের মতো দেখতে একটি চিত্র। জ্ঞানের স্তরে রাখা হয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি। তবে পিরামিডের সর্বোচ্চ ধাপ প্রজ্ঞা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে দাঁড়িপাল্লার প্রতীক।
এই ছবিকে কেন্দ্র করেই মূলত বিতর্কের সূত্রপাত। পরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হলে প্রতীকটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় এনসিটিবি।
সংস্থাটির সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের প্রায় ৩৮ লাখ কপি ছাপানো হচ্ছে। এর অধিকাংশের মুদ্রণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। একই শিক্ষাবর্ষের জন্য বিভিন্ন শ্রেণির মোট প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর কাজও চলছে।
এ অবস্থায় একটি বইয়ের প্রতীক সংশোধনের জন্য বড় পরিসরে বই সংগ্রহ ও পুনরায় বিতরণ করতে হলে সামগ্রিক কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
আগের বইয়ে কী প্রতীক ছিল?
আগের শিক্ষাবর্ষের বইয়ের সঙ্গে তুলনা করলে প্রজ্ঞার প্রতীক নিয়ে পরিবর্তনের বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকার ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য পরিমার্জিত ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়েও প্রজ্ঞা বোঝাতে দাঁড়িপাল্লার ছবি রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে, চলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি। কিন্তু ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে আবারও দাঁড়িপাল্লার ছবি যুক্ত করা হয়। এ নিয়ে বিতর্কের পর এবার সেটি বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিটিবি।
বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রজ্ঞা বা প্রজ্ঞাবোধ বোঝানোর জন্য একটিমাত্র প্রতীক সর্বজনস্বীকৃত নয়। বিভিন্ন সময় ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতিতে বই কিংবা প্যাঁচার মতো প্রতীকও প্রজ্ঞার প্রতিনিধিত্ব করেছে।
তবে ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ে দাঁড়িপাল্লার পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত কোন প্রতীক ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি এনসিটিবি।
