কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গাপূজার মণ্ডপে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর পূজা কমিটির সঙ্গে বিজেপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য তুলে ধরে রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে, এতগুলো প্রাণহানির ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তৃণমূলের বক্তব্য অনুযায়ী, চোরবাগান দুর্গাপূজা কমিটির প্রকাশিত একটি পোস্টারে দেবদীপ অধিকারীকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাতিজা বলে দাবি করেছে দলটি। একই পোস্টারে জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝার নাম পূজা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছে। উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের সম্পৃক্ততার কথাও সামনে এনেছে তৃণমূল।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক পোস্টে তৃণমূল কংগ্রেস এসব নাম উল্লেখ করে জানতে চেয়েছে, দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে কি না। দলটির প্রশ্ন, পূজামণ্ডপের উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।

তবে পূজা কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা পোস্টারে নাম থাকা মানেই দুর্ঘটনার জন্য কারও দায় প্রমাণিত হওয়া নয়। কারও বিরুদ্ধে আইনি দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের ফল ও প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে দুর্ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ঘটনায় কারও গাফিলতি পাওয়া গেলে তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মণ্ডপের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার পর পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পূজা কমিটির কয়েকজন কর্মকর্তা, ভিআইপি পাস ব্যবস্থাপনা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে পূজা কমিটির পোস্টারে নাম থাকা দেবদীপ অধিকারী, বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা এবং জেলা সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের নাম গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

দুর্ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। মুখ্যমন্ত্রীর ভাতিজার বয়স বা তিনি কলকাতায় থাকেন কি না, সে সম্পর্কেও তিনি অবগত নন বলে জানান। একই সঙ্গে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকার কথা উল্লেখ করে তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানাতে চাননি তিনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। আহত ব্যক্তিরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোববার সকালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেন। পরিস্থিতির কারণে দুর্গাপূজা উপলক্ষে তাঁর নির্ধারিত কিছু কর্মসূচিও স্থগিত রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের জন্য হাইকোর্টের একজন বর্তমান বিচারপতির নেতৃত্বে ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠনের ঘোষণার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন—ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় ত্রুটি ছিল, এবং তদন্তে যাঁদের দায় প্রমাণিত হবে তাঁদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাজনৈতিক অভিযোগের পাশাপাশি তদন্তের নিরপেক্ষতা ও হতাহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version