জার্মানির গোয়েন্দা অঙ্গনে বড় ধরনের চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। দেশটির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস—বিএনডির সাবেক প্রধান অগাস্ট হ্যানিংকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ৮০ বছর বয়সী এই সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ, পাচার এবং গুপ্তচরবৃত্তির মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

জার্মানির ফেডারেল প্রসিকিউটর কার্যালয় এক বিবৃতিতে হ্যানিংকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দেশটির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের প্রধান রাজনৈতিক সম্পাদক ঘটনাটিকে চলতি শতাব্দীর অন্যতম বড় গোয়েন্দা কেলেঙ্কারি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে জার্মানির পশ্চিমাঞ্চল থেকে হ্যানিংকে আটক করা হয়। একই অভিযানে তার সাবেক প্রধান সহকারী হিসেবে পরিচিত ‘ম্যানফ্রেড ডি’কেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে বাভারিয়া থেকে আটক করে তদন্তকারী সংস্থা।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিএনডির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন হ্যানিং। কিন্তু পদ ছাড়ার পরও সংস্থাটির গোপন ও সংবেদনশীল তথ্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন তার সাবেক সহকারী ম্যানফ্রেড ডি। তদন্তকারীদের দাবি, বিএনডিতে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রধানের অধীনে কাজ করার সুবাদে তিনি সংস্থার অত্যন্ত স্পর্শকাতর নথিতে প্রবেশাধিকার পেতেন। সেই সুযোগ ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে গোপন নথি সংগ্রহ করে হ্যানিংয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় দুই হাজার সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি গোপনে হ্যানিংয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এসব তথ্যের বিনিময়ে ম্যানফ্রেড ডি অর্থ পেয়েছেন বলেও তদন্তকারীদের অভিযোগ।

শুধু গোপন নথি সংগ্রহের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল না বলে দাবি তদন্তকারীদের। অভিযোগ রয়েছে, হ্যানিং ওইসব তথ্য নিজের ব্যক্তিগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা কনসালটেন্সি ব্যবসার কাজে ব্যবহার করতেন।

এমনকি একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল এবং তাদের কাছে রাজনৈতিক তথ্য সরবরাহের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বড় একটি গোপন তথ্য পাচারের তদন্ত সরাসরি বিএনডিকে ঘিরে শুরু হয়নি। অন্য একটি বহুল আলোচিত মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ঘটনাটি তদন্তকারীদের নজরে আসে।

জার্মান ব্যবসায়ী ক্রিস্টিনা ব্লকের সন্তানদের অপহরণ সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে হ্যানিংয়ের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছিল। সেই অভিযানে তদন্তকারীরা বিপুল পরিমাণ গোপন নথি এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য খুঁজে পান বলে জানা গেছে।

সেখান থেকেই তদন্তের গতিপথ বদলে যায়। নতুন তথ্যের ভিত্তিতে হ্যানিংয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গোপন নথির যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু হয়। ধীরে ধীরে তদন্তকারীদের সামনে আসে দীর্ঘ সময় ধরে গোপন তথ্য আদান-প্রদানের অভিযোগ।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর জার্মানির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কারণ অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশে দীর্ঘদিন ধরে গোপন তথ্যের অপব্যবহার হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসবে।

পার্লামেন্টের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিকরাও ঘটনাটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর বিষয় হিসেবে দেখছেন। এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিলেন কি না এবং রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য শেষ পর্যন্ত কোথায় কোথায় পৌঁছেছে—তা দ্রুত খুঁজে বের করার দাবি উঠেছে।

তদন্তকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এত দীর্ঘ সময় ধরে সংবেদনশীল সরকারি নথি কীভাবে বিএনডির নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে চলে গেল এবং এর পেছনে আর কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন সক্রিয় ছিল কি না।

হ্যানিং ও তার সাবেক সহকারীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পূর্ণ চিত্র তদন্ত শেষ হওয়ার পরই পরিষ্কার হবে। তবে সাবেক একজন গোয়েন্দা প্রধানকে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা এরই মধ্যে জার্মানির নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version