দেশে হামের ভয়াবহ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গ মিলিয়ে চলতি বছরে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৪ জনে।

এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছেন ১০১ জন। আর ১ হাজার ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮৪ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২৫৫ জন নতুন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মঙ্গলবারের নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের, একজন চট্টগ্রাম বিভাগের এবং একজন সিলেট বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেই হিসাবে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৫ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৯৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার ৫১০ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ২১ হাজার ৩৯২ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। তবে সব উপসর্গযুক্ত রোগীর পরীক্ষা করা হয় না, ফলে মোট আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও ভিন্ন হতে পারে।

বিভাগভিত্তিক হিসাবেও পরিস্থিতির বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা ও রংপুর বিভাগ।

হামের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রাদুর্ভাব নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। তারা শুধু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা প্রকাশের পাশাপাশি এই পরিস্থিতির পেছনের কারণগুলো বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, টিকাদানের ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ এবং শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলাদা করে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা রুটিন টিকাদান ব্যবস্থায় আগের সময়ের ব্যাঘাত এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের একটি বড় অংশকে বর্তমান প্রাদুর্ভাবের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জনস্বাস্থ্যবিদদের বক্তব্য হলো, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালানো যথেষ্ট নয়। কোন পর্যায়ে কোথায় ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, কত শিশু টিকার বাইরে ছিল এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেন এত বড় চাপের মুখে পড়ল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাও জরুরি।

কারণ, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই সঙ্গে নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। ফলে আক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণের উৎস ও বিস্তারের কারণ চিহ্নিত করাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি হাম ও রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জরুরি কর্মসূচির লক্ষ্য এমন শিশুদের টিকা দেওয়া যারা আগে বাদ পড়েছিল বা নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আসেনি।

সব মিলিয়ে দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধান, টিকাদানের ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কার্যকর পরিকল্পনার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version