বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন কৌশলে অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দেশীয় অর্থ বিদেশে গিয়ে বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, গাড়ি, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ হচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে দেশের ভেতরে সঞ্চয় ও উদ্যোক্তাদের অর্থ থাকলেও নতুন শিল্প, ব্যবসা, আবাসন ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থপাচার বন্ধ করতে হলে শুধু অবৈধ অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করলেই হবে না। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে বৈধ বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ, স্থিতিশীল, লাভজনক ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে অর্থপাচারের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়েও পুরোপুরি থামেনি। বর্তমানে অর্থপাচার প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)সহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
অর্থপাচার প্রতিরোধে বিএফআইইউ সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর সংস্থাটি জাতীয় অর্থপাচার ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করে। এর আগে ১৩ মে বিএফআইইউ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে কর্মশালা করে। এছাড়া ৮ ও ৯ মে বিএফআইইউর উদ্যোগে ক্যামলকো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থপাচারের ঝুঁকি মূল্যায়ন, পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও উদ্ধারের সক্ষমতা এবং আর্থিক খাতের নজরদারি আরও জোরদার করার চেষ্টা চলছে।
বছরে শত শত কোটি ডলারের অবৈধ অর্থপ্রবাহ
গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলারের অর্থ অবৈধভাবে দেশের বাইরে যাওয়ার হিসাব পাওয়া যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির বিশ্লেষণে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশ থেকে মোট প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হিসাবে বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার অর্থ পাচার হয়েছে।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনের হিসাবের পদ্ধতি ও আওতা ভিন্ন হওয়ায় পরিসংখ্যানগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২ কোটি ৫৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। বছর শেষে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে বিনিয়োগের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৩ কোটি ১০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এসব বিনিয়োগ ১৮টি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে।
সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট বেড়েছে
বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের রিপোর্টের সংখ্যা বেড়ে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি।
বিএফআইইউর মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স কার্যক্রম এবং লেনদেন পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তের সংখ্যাও বেড়েছে।
অন্যদিকে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিক ও বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর নামে মোট ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ ছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সেখানে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে।
দেশে বিনিয়োগ কমছে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পর এটি সর্বনিম্ন পর্যায়।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল হলে উদ্যোক্তাদের একটি অংশ অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের সুযোগ খুঁজতে পারেন। তবে বৈধ বিদেশি বিনিয়োগ এবং অবৈধ অর্থপাচারকে একই বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার শনাক্তে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কাস্টমস, কর বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ব্যাংকিং খাতের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং ঝুঁকি শনাক্তকরণ জোরদারে একটি আন্তসংস্থা স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।
যেসব পথে অর্থ পাচারের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের তুলনায় বেশি মূল্য দেখিয়ে আমদানি করা বা ওভার ইনভয়েসিং একটি পদ্ধতি। আবার প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমেও অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ভুয়া আমদানি-রপ্তানি, পণ্যের পরিমাণ বা মূল্য সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ ঘোরানো এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমেও অর্থ দেশের বাইরে চলে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বিএফআইইউর এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, সাইপ্রাস, ফিলিপাইন, ভারত, লুক্সেমবার্গ, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, জার্সি, গার্নসি, আইল অব ম্যান এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসসহ বিভিন্ন দেশ ও অফশোর এখতিয়ারের সঙ্গে অর্থের গতিপথের তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনি সংস্কারের ওপর জোর
চলতি বছরের ৯ জুন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ভবিষ্যতে অর্থ ও মূলধন পাচার ঠেকাতে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থপাচার প্রতিরোধের আইনি কাঠামো হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনও রয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃত মালিকানার নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুসহ বিভিন্ন আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, কর ফাঁকি এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে চালান জালিয়াতি বন্ধ করা অর্থপাচার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের যোগসাজশ ও দুর্নীতি বন্ধ করা প্রয়োজন।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডে (সিআরএস) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির ওপরও গুরুত্ব দেন। তার মতে, এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের দেশি-বিদেশি লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বেনামি কোম্পানির মাধ্যমে অর্থপাচার ঠেকাতে প্রকৃত মালিকানা বা বেনিফিশিয়াল ওনারশিপের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য আইন ও নিবন্ধন ব্যবস্থার প্রয়োজন বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
শুধু পাচার ঠেকালেই হবে না
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, অর্থপাচার প্রতিরোধের পাশাপাশি দেশের ভেতরে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ানো না গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন হবে।
তার মতে, উদ্যোক্তারা তখনই দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যখন তারা সম্পদের নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক নীতির স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ মুনাফা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাবেন।
এ জন্য বিনিয়োগ অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা, কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, কর ও শিল্পনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, শিল্পের জন্য জমি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ, পরিবহন ও বন্দরসেবা সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিনিয়োগ পরিকল্পনাতেও ডিরেগুলেশন, দীর্ঘমেয়াদি কর-স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত খাতে প্রণোদনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে নীতির ধারাবাহিকতা এবং ঘোষিত সংস্কারের বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থপাচার রোধের কার্যক্রম শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অভিযান কিংবা ব্যাংক হিসাব পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়। বাণিজ্যিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ, কাস্টমস ও কর তথ্যের সঙ্গে ব্যাংকিং তথ্যের সমন্বয়, প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং দ্রুত অবৈধ সম্পদ ফ্রিজ করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে দেশের ভেতরে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করাও প্রয়োজন। উদ্যোক্তারা যদি নিরাপদে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন, নীতির ধারাবাহিকতা পান, ব্যবসায়িক অনুমোদন সহজ হয় এবং অর্থায়নের সুযোগ বাড়ে, তাহলে দেশীয় সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা বাড়বে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানের মতে, সঠিক তথ্য, স্থিতিশীল নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক বিনিয়োগ পরিবেশ—এই বিষয়গুলোর সমন্বয়ই গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে উদ্যোক্তাদের অর্থ দেশে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি রহমানও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে শিল্প খাতের যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক আস্থার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলেছেন। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখছেন।
সব মিলিয়ে অর্থপাচার বন্ধের জন্য একদিকে যেমন অবৈধ অর্থের উৎস, পথ ও গন্তব্য শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশে বৈধ বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করে তোলাও জরুরি। কারণ শুধু অর্থ বিদেশে যাওয়া ঠেকানো নয়, সেই অর্থকে দেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে ধরে রাখার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।

