ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অন্যান্য স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সারাদেশে আলাদা চলাচলের ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট পার্কিং এবং চার্জিং স্টেশন নির্মাণের দাবি জানিয়েছে ‘রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ’।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি ছয় দফা দাবি তুলে ধরে। দাবি বাস্তবায়নে আগামী সেপ্টেম্বরে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১০ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে সমাবেশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন লিখিত বক্তব্যে বলেন, সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। তবে তাদের আশঙ্কা, উৎপাদন থেকে শুরু করে চার্জিং, নিবন্ধন, লাইসেন্স এবং সড়কে চলাচল—সবকিছু যদি কেবল ব্যবসাকেন্দ্রিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে প্রায়ই যানজট, দুর্ঘটনা কিংবা বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী করা হয়। কিন্তু এসব যান কেন বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন এবং সাধারণ যাত্রীরা কেন এগুলো ব্যবহার করছেন, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সংগঠনটির দাবি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক মানুষ রিকশা ও ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পাশাপাশি তুলনামূলক কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে যাত্রীদের কাছেও এসব যান জনপ্রিয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়েও বাস্তবতা বিবেচনা করা দরকার। বিদ্যুৎ সংকট তুলনামূলক কম থাকায় অনেক চালক রাতের দিকে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে থাকেন।
সংগ্রাম পরিষদের নেতারা জানান, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য একটি কার্যকর ও সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের দাবিতে তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৩ বছর ধরে বিআরটিএর অধীনে প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন, রুট পারমিট ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। এ আন্দোলনের সময় বিভিন্ন এলাকার নেতাকর্মীদের মামলা ও কারাবরণের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা।
সংগঠনটির ছয় দফা দাবি
প্রথমত, প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন ও রুট পারমিটের আওতায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে এনে একটি সমন্বিত নীতিমালা ও বিধিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সরকারি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ই-রিকশা তৈরি ও বাজারজাতের সুযোগ দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মেকানিকদের আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটকে বিশেষ সুবিধা না দেওয়ার দাবি রয়েছে।
তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত পার্কিং ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারিতে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
চতুর্থত, লাইসেন্স, নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খরচ ও পর্যাপ্ত সূর্যালোকের মতো বিষয়গুলো বাস্তব সমস্যার কারণ হতে পারে।
পঞ্চমত, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইকসহ অন্যান্য যানবাহনকে সরকার অনুমোদিত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে অন্তত দুই বছর সময় দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ষষ্ঠত, মহাসড়কে স্বল্পগতির ও স্থানীয় যানবাহনের জন্য পৃথক লেন অথবা সার্ভিস রোড নির্মাণের দাবি উঠেছে। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে একদিকে যানজট কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির যান চলাচলের সংঘাতও কমতে পারে।
সংগঠনটি বলছে, ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে নিষিদ্ধ বা একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে চালক, যাত্রী, যানবাহন মালিক ও স্থানীয় শিল্পের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।
