জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়সহ বিশ্বের উঁচু পর্বতাঞ্চলে বরফ, মাটি ও পাথরের স্বাভাবিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হয়ে ভূমিধস, হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত এলাকায় সাম্প্রতিক একটি ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৩৫৯ জনে পৌঁছেছে এবং প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক রয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ, মাটি ও পাথর একটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করে পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। এর ফলে প্রবল স্রোত আশপাশের পাহাড়ি জনপদে আঘাত হানে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
উষ্ণতা বাড়ায় দুর্বল হচ্ছে পাহাড়ের ঢাল
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উঁচু পাহাড়ে জমে থাকা বরফের স্থায়িত্ব কমছে। একই সঙ্গে বরফ গলে অতিরিক্ত পানি তৈরি হওয়ায় পাহাড়ের ঢাল ও পাথরের কাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে।
আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্সের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে খাড়া পাহাড়ি ঢালে বরফের যে প্রাকৃতিক বন্ধন রয়েছে, তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বরফ গলার হার বাড়লে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফলে আগে যেসব পাহাড়ি এলাকা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, সেখানেও বড় ধরনের ধসের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যত বাড়বে, এ ধরনের ঘটনা তত ঘন ঘন ঘটতে পারে।
ভূমিকম্প ও হিমবাহ ধসের সম্ভাব্য যোগসূত্র
সাম্প্রতিক দুর্যোগের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা। প্রাথমিক বিশ্লেষণে নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের উত্তর ঢালে বড় ধরনের হিমশিলা বা বরফের অংশ ধসে পড়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। পরে সেটি তিব্বতের একটি নদীতে গিয়ে পড়লে আকস্মিক পানির প্রবাহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ইসিমোডের ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ফারুক আজমের মতে, অতিরিক্ত বরফ গলার পাশাপাশি ভূকম্পনও পাহাড়ি ধসের অন্যতম কারণ হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির ডিন বেঞ্জামিন হর্টন মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফযুক্ত মাটি গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হওয়ার পর যদি সেখানে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক ঘটনা যুক্ত হয়, তাহলে দুর্যোগের মাত্রা অনেক বেড়ে যেতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো
দুর্যোগের প্রভাবে সীমান্তবর্তী এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কয়েকটি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জিরং স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও নদীর প্রবল স্রোতের কারণে ভারত সীমান্তের দিকে ভাটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলেও নদীর গতিপথ ও আশপাশের এলাকার ওপর প্রভাব পড়েছে বলে জানা গেছে।
ভবিষ্যতের ঝুঁকি আরও বড় হতে পারে
হিমালয় ও হিন্দুকুশ অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জিরংয়ে বন্যা, নেপালের থামে এলাকায় হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ এবং সিকিমের ভয়াবহ দুর্যোগ—এসব ঘটনাকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাড়তি ঝুঁকির উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্যেও হিমালয় অঞ্চলে বরফ গলে যাওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। কয়েক দশকের মধ্যে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়ে বরফের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে পানিসম্পদ, কৃষি, জনবসতি ও পাহাড়ি অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ইসিমোডের গবেষকদের মতে, জল, ভূমি ও আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন শুধু তাৎক্ষণিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না; বরং হিমালয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, পাহাড়ি এলাকার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন হতে পারে।
