পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ থাকলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে তাড়াহুড়ো করে কোনো শীর্ষ পর্যায়ের সফরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নানা খবর প্রকাশ হলেও এসব প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হুমায়ুন কবির জানান, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছে। তবে দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিষয়ে সমঝোতা তৈরি হলে এবং সফরের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিতে পারে ঢাকা।
ভারত সফরের ক্ষেত্রে আস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের ভারত সফরের আগে ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে নয়াদিল্লির সুস্পষ্ট উপলব্ধি প্রয়োজন।
তার ভাষায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে পরিবর্তন এসেছে, ভারতকে সেটি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারত ভবিষ্যতে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি না হলে ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা খুব বেশি নয় বলেও জানান তিনি।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থানের সমালোচনা
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির।
তার অভিযোগ, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতে অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য বা গণমাধ্যমে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে সাজাপ্রাপ্ত বা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানায় ঢাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নয়াদিল্লিকে কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে কৌশলগত ভারসাম্য
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি জানান, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ।
সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফরের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। গ্রীষ্মের পর সফরটি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য, দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানোর মাধ্যমে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
সব মিলিয়ে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে এগোতে চাইছে। এসব বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হলেই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পথ সহজ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন হুমায়ুন কবির।
