ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ছিল, তার নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল হয়নি।

ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর কি আবার সরাসরি সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র?

গত জুনে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

উদ্দেশ্য ছিল, সাময়িকভাবে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথ তৈরি করা। কিন্তু সময়সীমা শেষ হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি কিংবা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে স্থায়ী সমাধান আসেনি।

বরং গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের জায়গায় এখন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপের লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে।

হরমুজেই সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি।

পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেই তার প্রভাব পড়ে।

যুদ্ধবিরতির সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিল, হরমুজ দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হবে।

কিন্তু ইরান সেই অবস্থানে যায়নি।

তেহরানের বক্তব্য ও কার্যক্রম থেকে বরং ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, কৌশলগত এই জলপথের ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতেই তারা আগ্রহী।

ইরানের জন্য হরমুজ শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি এমন একটি কৌশলগত হাতিয়ার, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসানোর সুযোগ পাওয়া যায়।

ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র—এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধ?

যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক হামলা তুলনামূলকভাবে কমলেও সংঘাত শেষ হয়ে যায়নি।

বরং নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে দ্বন্দ্বটি।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্রপথে চাপ তৈরির মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পাল্টা চাপ তৈরি করছে।

অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে এখন শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলার প্রতিযোগিতা নয়—তেল, বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা এবং সমুদ্রপথ নিয়েও চলছে পাল্টা কৌশল।

এই অর্থনৈতিক সংঘাত যদি আরও দীর্ঘ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেটি আবার সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও সমাধান নেই

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান এমন পর্যায়ে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করবে।

ইরান অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

এই বিরোধের সমাধান খুঁজতেই যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি আলোচনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।

কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই আলোচনায় চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

ফলে যুদ্ধবিরতির সময় শেষ হলেও সংঘাতের মূল কারণগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই।

হরমুজ নিয়ে কেন এত কঠোর অবস্থানে ইরান?

হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রণালির ওপর প্রভাব ধরে রাখতে পারলে তেহরান আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর সুযোগও পায়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজের নিরাপদ ও অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে।

ফলে দুই দেশের স্বার্থ এখানে সরাসরি মুখোমুখি।

আবার কি বড় সামরিক অভিযান হতে পারে?

সংঘাতের আগের পর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই মাত্রার অভিযান চালানো হয়নি।

এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের উদ্বেগ, আঞ্চলিক সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর সম্ভাব্য চাপ—এসব বিষয় ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ প্রয়োজন হয়। ফলে সামরিক মজুতের ওপর চাপও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

এখন সামনে কী?

৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার মূল বিরোধগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে।

আর ইরানও হরমুজকে ব্যবহার করে নিজের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুই দেশ কি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরবে, নাকি নতুন করে সামরিক উত্তেজনা শুরু হবে?

যদি কূটনৈতিক সমঝোতা না হয় এবং হরমুজের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে একটি ছোট সামরিক ঘটনা থেকেও বড় সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আর সেই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

তাই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়াকে সংঘাতের সমাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বরং এখন শুরু হতে পারে আরও কঠিন এক পর্ব—যেখানে একদিকে থাকবে কূটনৈতিক দরকষাকষি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ এবং এর আড়ালে থাকবে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা।

শেষ পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে যায়—সমঝোতা, নাকি আবারও যুদ্ধ—তার অনেকটাই নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং পারমাণবিক ইস্যুতে দুই পক্ষ কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত তার ওপর।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version