নিয়মিত রক্তচাপের ওষুধ খাওয়ার পরও কারও কারও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসতে চায় না। এর পেছনে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, জীবনযাপনের ধরন, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে কিছু পরিচিত ওষুধও রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে কিংবা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে নিজের ইচ্ছায় ব্যথানাশক, সর্দি-কাশির ওষুধ, কিছু স্টেরয়েড, হরমোনজাতীয় ওষুধ বা নির্দিষ্ট কিছু মানসিক রোগের ওষুধ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে নিজের উচ্চ রক্তচাপের কথা জানানো তাই গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু ব্যথানাশক ওষুধ

ব্যথা বা প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত NSAID শ্রেণির কিছু ওষুধ, যেমন আইবুপ্রোফেন ও ন্যাপ্রোক্সেন, শরীরে পানি ও সোডিয়াম ধরে রাখতে পারে। এর ফলে কিছু মানুষের রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে এসব ওষুধ কিছু ক্ষেত্রে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধের কার্যকারিতাও কমাতে পারে।

তাই দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সর্দি-কাশির কিছু ওষুধ

সর্দি-কাশির সব ওষুধ উচ্চ রক্তচাপের জন্য সমস্যা তৈরি করে না। তবে কিছু ওষুধে থাকা নাক বন্ধভাব কমানোর উপাদান বা decongestant রক্তনালি সংকুচিত করতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

Pseudoephedrine ও phenylephrine এ ধরনের উপাদানের উদাহরণ। তাই উচ্চ রক্তচাপ থাকলে বাজার থেকে কম্বিনেশন কোল্ড বা ফ্লুর ওষুধ কেনার আগে লেবেলে উপাদানগুলো দেখে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত বা খুব বেশি থাকলে এসব ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ

Prednisone বা methylprednisolone-এর মতো systemic corticosteroid কিছু মানুষের রক্তচাপ বাড়াতে পারে। এসব ওষুধ শরীরে সোডিয়াম ও পানি ধরে রাখার প্রবণতা বাড়াতে পারে বলে এমন প্রভাব দেখা দিতে পারে।

তবে অ্যালার্জি, প্রদাহ বা অন্য কোনো চিকিৎসার জন্য স্টেরয়েড প্রয়োজন হলে শুধু উচ্চ রক্তচাপের কারণে নিজের সিদ্ধান্তে তা বন্ধ করা উচিত নয়। চিকিৎসক যে মাত্রা ও সময় নির্ধারণ করেন, সেটিই অনুসরণ করতে হবে।

কিছু হরমোনযুক্ত গর্ভনিরোধক

কিছু হরমোনযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নির্দিষ্ট মানুষের ক্ষেত্রে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন নারীদের গর্ভনিরোধক বেছে নেওয়ার সময় চিকিৎসককে আগের রক্তচাপের ইতিহাস জানানো গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে রক্তচাপ যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে কোন ধরনের গর্ভনিরোধক উপযুক্ত হবে তা চিকিৎসকের পরামর্শেই নির্ধারণ করা উচিত।

কিছু বিষণ্নতার ওষুধ

বিষণ্নতা বা অন্যান্য মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধও রক্তচাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সব antidepressant রক্তচাপ বাড়ায়—এমন নয়। ওষুধের ধরন, মাত্রা এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।

তাই উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি বিষণ্নতা বা উদ্বেগের চিকিৎসা চললে রোগী নিয়মিত কী কী ওষুধ খাচ্ছেন, তা চিকিৎসককে জানানো প্রয়োজন।

শুধু রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করে দেবেন না

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্য কোনো ওষুধ শুরু করার পর নিজের সিদ্ধান্তে রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ না করার পরামর্শ দেয়।

নতুন কোনো ওষুধ প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে নিয়মিত ব্যবহৃত সব ওষুধের তালিকা জানানো উচিত। এতে সম্ভাব্য ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া এবং রক্তচাপ বাড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই সতর্ক হওয়া যায়।

আর রক্তচাপ যদি হঠাৎ ১৮০/১২০ mmHg বা তার বেশি হয় এবং একই সঙ্গে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা বা অবশভাব, দৃষ্টির সমস্যা কিংবা কথা বলতে অসুবিধার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে এটি জরুরি পরিস্থিতি হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

তাই উচ্চ রক্তচাপ থাকলে যেকোনো নতুন ওষুধ—বিশেষ করে ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ—নিজে থেকে শুরু না করে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করাই নিরাপদ। কারণ একটি ওষুধ একজনের জন্য উপযুক্ত হলেও অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা রক্তচাপ বা অন্য শারীরিক সমস্যায় প্রভাব ফেলতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version