একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু যখন একটি সাত বছরের শিশুকে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় এবং তার বাবা প্রকাশ্যে বলেন, “আমি বিচার চাই না”, তখন সেটি কেবল একটি অপরাধের ঘটনা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতার ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটিকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি শুধু মানবিক অনুভূতিকেই আঘাত করেনি, বরং নিরাপত্তা ও বিচারহীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ঘটনার পর গণমাধ্যমের সামনে রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লার বক্তব্য অনেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, বিচার চেয়ে লাভ নেই; কয়েকদিন আলোচনা চলবে, তারপর ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাবে। তার এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থা।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বারবার ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। অতীতের বহু আলোচিত ঘটনাতেও দ্রুত বিচার না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আস্থা হারিয়েছে।

নরসিংদীর কিশোরী আমেনা হত্যা, নোয়াখালীর আলোচিত নির্যাতনের ঘটনা কিংবা একাধিক সিরিয়াল হত্যাকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অপরাধের বিচার না হওয়া কিংবা বিলম্বিত হওয়া নতুন অপরাধকে উৎসাহিত করে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে যৌন সহিংসতা ও বিচারহীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, থানায় মামলা গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা এবং আদালতের কার্যক্রম—সব জায়গাতেই কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে এখন একটাই দাবি জোরালো হচ্ছে—নিরাপদ জীবন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। অনেকেই বলছেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় সে কতটা তার সবচেয়ে দুর্বল ও ছোট নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারে তার ওপর। রামিসার ঘটনা সেই জায়গাতেই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

দেশজুড়ে এখন দাবি উঠেছে—এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে না হয়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version