সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তাঁর মতে, সরকারকে স্বস্তিতে থাকতে দিতে চান না শেখ হাসিনা। তবে দেশে নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলেই ডিসেম্বর মাসে তাদের দেশে ফেরার পথ সহজ হয়ে যাবে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই উপদেষ্টা। তাঁর ধারণা, এ ধরনের তৎপরতা শুধু ডিসেম্বর মাসকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শেখ হাসিনা যত দিন জীবিত থাকবেন, তত দিন এমন চেষ্টা চলতে পারে। তবে সরকার এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন এবং এতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই সরকার আগেভাগে মজুরি কমিশন গঠন করেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, সাধারণত পাঁচ বছর পরপর পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনা করা হয়। ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সেই হিসাবে ২০২৬ সালে নতুন করে মজুরি কমিশন গঠনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তারপরও শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনা করে সরকার কমিশন গঠন করেছে।
আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উপদেষ্টা বলেন, প্রকৃত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড হওয়ার কথা নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব ঘটনার পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন থাকার কথা জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন সরাসরি বড় কোনো তৎপরতা চালাতে পারবে বলে সরকার মনে করে না। তবে দলটির কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে বলে তাঁর দাবি। এই অর্থ ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এসব ঘটনার সঙ্গে ডিসেম্বর মাসের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনার যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে জানান উপদেষ্টা। তবে শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
শ্রমিক আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের পাশাপাশি অন্যদের অংশগ্রহণ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সরকার আগের মতো কঠোর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমন করতে চায় না। আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণেরাও দেশের নাগরিক। তাই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগ কমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সরকার। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, সরকার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী। তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরুন অথবা তাঁকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক—সরকারের অবস্থান একই। তবে তাঁর পাসপোর্টসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা ট্রাভেল পাস দেওয়ার বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে চাননি তিনি। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
পুলিশের বলপ্রয়োগের বিষয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই আইন মেনে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। আগের সরকারের সময় আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের যে চর্চা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সময় সর্বনিম্ন ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত পুলিশের মূল লক্ষ্য।
