তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ও সংশ্লিষ্ট চার্জ না বাড়িয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট তৈরি, মজুত গোপন এবং অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ক্যাবের তথ্য কর্মকর্তা আনোয়ার পারভেজের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির মূল্যহার পরিবর্তনের বিষয়ে গণশুনানির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ শুনানিকে সামনে রেখে গত ২৬ অক্টোবর কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠান ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ভোক্তাদের জন্য নির্ধারিত দাম কার্যকর করার আগেই নতুন করে মূল্য ও বিভিন্ন চার্জ বাড়ানো হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে অনেক ভোক্তাকে।
সংগঠনটি বলছে, পাইপলাইনের গ্যাসের সুবিধা নেই—এমন পরিবারগুলোর রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি এলপিজি। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচ সামলানোর পর রান্নার গ্যাসের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা অনেক পরিবারের পক্ষে কঠিন। তাই নতুন করে দাম বাড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যমান মূল্য কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আমদানিকারকদের ব্যয় বৃদ্ধির দাবিও যথাযথভাবে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটির মতে, প্রকৃত লেনদেনের নথি ও নিরীক্ষিত হিসাবের ভিত্তিতে ব্যয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়লেও স্থানীয় পরিবহণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয় একই হারে বাড়বে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। একই ব্যয় একাধিকবার হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা ব্যবসায়িক অদক্ষতার বোঝা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
ক্যাবের সাত দফা দাবি
১. নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত: এলপিজির দাম ও সংশ্লিষ্ট চার্জ না বাড়িয়ে বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করতে হবে।
২. অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধ: কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুত গোপন ও সরবরাহ সীমিত করার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
৩. ব্যয় যাচাই করে মূল্য নির্ধারণ: নিরীক্ষিত হিসাব ও নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়নে যৌক্তিকতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত চার্জ ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা যাবে না। অযৌক্তিক ব্যয় ও অতিরিক্ত মুনাফা মূল্য নির্ধারণের হিসাব থেকে বাদ দিতে হবে।
৪. ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ: আমদানি, মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ ও বিতরণ ব্যয়ের পৃথক হিসাব প্রকাশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যয় কমলে তার সুফলও দ্রুত ভোক্তাদের দিতে হবে।
৫. সরকারি এলপিজি সহজলভ্য করা: সরকারি এলপিজির ব্যয় পৃথকভাবে মূল্যায়ন করে স্বচ্ছ বরাদ্দ ও বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
৬. মূল্যতালিকা ও রসিদ বাধ্যতামূলক করা: প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং বিক্রির রসিদ দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহণ ও বাসায় পৌঁছে দেওয়ার খরচ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে অননুমোদিত অর্থ আদায় বন্ধ করতে হবে।
৭. অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার: অতিরিক্ত দাম, সিলিন্ডারের সংকট, কম ওজন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গণশুনানিতে ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনার আহ্বান
ক্যাবের মতে, এলপিজির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের প্রস্তাব ও কমিশনের কারিগরি মূল্যায়নের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংগঠনটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কোন ব্যয় গ্রহণ করা হয়েছে, কোনটি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং উত্থাপিত আপত্তিগুলোর কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
ক্যাবের প্রত্যাশা, এলপিজির দাম ও চার্জ বাড়ানোর পরিবর্তে নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায় বন্ধে বিইআরসি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
