জাতীয় সংসদে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে স্পিকারের আক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে প্রার্থী মনোনয়ন দেয় না। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়।
তবে শুধু আক্ষেপ প্রকাশ না করে সংসদীয় ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের সম্পদ, ব্যবসায়িক স্বার্থ, উপহার গ্রহণ এবং বিদেশ সফরের ব্যয়ের তথ্য নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তাসনিম জারা।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।
পোস্টে তাসনিম জারা উল্লেখ করেন, ভালো ও যোগ্য মানুষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়ে স্পিকারের বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী নির্বাচনের সময় সব ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও সততাকে অগ্রাধিকার দেয় না। আবার কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইলে তাঁকে বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানি ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
তবে তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের মতো শুধু হতাশা প্রকাশ করাই স্পিকারের দায়িত্ব হতে পারে না। বরং নিজের অবস্থান ও ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সংসদ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে তাঁর।
তাসনিম জারা মনে করেন, সংসদ সদস্যদের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে তাঁদের সম্পদ ও আর্থিক স্বার্থের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের জন্য একটি নিয়মিত নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করা।
তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী এবং প্রায় ৮০ শতাংশ কোটিপতি। তাঁর মতে, ব্যবসা করা কিংবা বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নিজে থেকে কোনো অপরাধ নয়। তবে এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং আয়ের উৎস বৈধ কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
তাসনিম জারা অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, অনেক সময় সংসদ সদস্য হওয়ার পর কারও জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। দামি গাড়ি, মূল্যবান ঘড়ি কিংবা নতুন ফ্ল্যাটের মতো সম্পদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে উপহার পাওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু কে উপহার দিয়েছেন, কী কারণে দিয়েছেন এবং এর পেছনে কোনো স্বার্থ জড়িত রয়েছে কি না, তা জানার সুযোগ সাধারণ মানুষের থাকে না।
তাঁর মতে, কোনো ব্যবসায়ী যদি একজন সংসদ সদস্যকে দামি গাড়ি বা অন্য কোনো মূল্যবান সামগ্রী উপহার দেন, তাহলে ভবিষ্যতে ওই ব্যবসায়ীর স্বার্থে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। সরকারি দপ্তরে ফোন করে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া কিংবা সংসদে নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। অথচ একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা।
এ ধরনের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়াতে সংসদ সদস্যদের আর্থিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তাসনিম জারার প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নির্দিষ্ট সময় পরপর নিজের সম্পদের বিবরণ, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে মালিকানা বা অংশীদারত্ব, কার কাছ থেকে কী ধরনের উপহার পেয়েছেন এবং কার অর্থায়নে বিদেশ সফর করেছেন, সে বিষয়ে তথ্য জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে এসব তথ্য জনসাধারণের জন্য অনলাইনে উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
তাঁর মতে, বর্তমানে নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের হলফনামায় সম্পদ ও আর্থিক তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও নির্বাচিত হওয়ার পরবর্তী সময়ে একই ধরনের তথ্য নিয়মিত প্রকাশের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনের আগে দেওয়া হলফনামার ওপর নির্ভর করাও যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি।
এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের হলফনামায় ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও নিজের পোস্টে তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের অভিযোগের যথাযথ যাচাই ও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। শুধু অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
নিজের প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তরাজ্যের উদাহরণও তুলে ধরেছেন তিনি। তাসনিম জারার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটিতে সংসদ সদস্যদের সম্পদ, উপহার এবং বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার তথ্য নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। নির্দিষ্ট সীমার বেশি মূল্যের উপহার, আমন্ত্রণ কিংবা বিদেশ সফরের সুবিধা পেলে সেসব তথ্য নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব তথ্য হালনাগাদ করে প্রকাশ করা হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যে একজন সংসদ সদস্য বিদেশি সরকারের অর্থায়নে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুবার ছুটি কাটানোর তথ্য নিবন্ধনে উল্লেখ করেননি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তাঁকে ৩০ দিনের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে পোস্টে দাবি করেন তাসনিম জারা।
তাঁর মতে, সংসদ সদস্যদের আর্থিক তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা চালু করলেই সব ধরনের দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে এর ফলে অনিয়ম করা কঠিন হবে এবং জবাবদিহির আওতা বাড়বে। কারণ, একজন সংসদ সদস্য নিজেই যখন কোনো উপহার বা আর্থিক সুবিধা গ্রহণের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করবেন, তখন পরবর্তী সময়ে গোপন তথ্য প্রকাশ পেলে আগের বক্তব্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে।
তাসনিম জারা মনে করেন, এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলে উপহার কিংবা সৌজন্য সাক্ষাতের আড়ালে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত লুকিয়ে রাখা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করার সুযোগও তৈরি হবে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে স্পিকার কী ভূমিকা রাখতে পারেন, সে বিষয়েও নিজের বক্তব্যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সংসদের কার্যপ্রণালি ও নিয়মকানুন নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় সংসদ সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং অনলাইনে প্রকাশের কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
তাসনিম জারার বক্তব্য, সরাসরি কোনো পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকলেও স্পিকার এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে উদ্যোগ নিতে পারেন।
পোস্টের শেষাংশে স্পিকারের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা উল্লেখ করে তাসনিম জারা আশা প্রকাশ করেন, তিনি নিজের অবস্থান কাজে লাগিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবেন। তাঁর মতে, যোগ্য ও সৎ মানুষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, স্পিকারের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাসনিম জারার এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো সংসদ সদস্যদের সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে জনগণের জানার সুযোগ বাড়ানো এবং তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা।
