দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে শ্রীলঙ্কার ইতিহাস খুব একটা সমৃদ্ধ নয়। তবে এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। কারণ, ঢাকায় খেলতে আসা লঙ্কান দলে রয়েছেন ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের ক্লাবে খেলা একাধিক ফুটবলার। ফলে এবারের শ্রীলঙ্কাকে আগের মতো দুর্বল প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে দক্ষিণ এশিয়ায় অনুষ্ঠিত হতো সার্ক গোল্ডকাপ ফুটবল। ১৯৯৩ সালের আসরে শিরোপা জিতেছিল ভারত। এরপর ১৯৯৫ সালে শ্রীলঙ্কার মাটিতে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় স্বাগতিকরা। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সেটিই ছিল শ্রীলঙ্কার প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র আঞ্চলিক শিরোপা।
এরপর সাফ গোল্ডকাপ কিংবা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের কোনো আসরেই ফাইনালে উঠতে পারেনি লঙ্কানরা। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে পিছিয়ে থাকা দল হিসেবেই পরিচিত ছিল তারা।
কিন্তু এবারের দলটির চিত্র কিছুটা ভিন্ন।
সাফ খেলতে ঢাকায় আসা শ্রীলঙ্কার স্কোয়াডে রয়েছেন অন্তত ১৬ জন ফুটবলার, যারা ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলছেন বলে জানা গেছে। ইংল্যান্ড, নরওয়ে, ফ্রান্স, সুইডেন ও জার্মানির পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া এবং কিরগিজস্তানের ক্লাব ফুটবলেও খেলেছেন বা খেলছেন দলের সদস্যরা।
ক্লাবগুলোর মান ও প্রতিযোগিতার স্তর এক নয়। তবে বিদেশি লিগে খেলার অভিজ্ঞতা ফুটবলারদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে। ভিন্ন পরিবেশে অনুশীলন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ম্যাচ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের সঙ্গে পরিচিতি—এসব অভিজ্ঞতা মাঠে কাজে লাগতে পারে।
শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলের গোলরক্ষকও খেলছেন বাংলাদেশের ক্লাব ফর্টিস এফসিতে। ফলে ঢাকার মাঠ ও পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত একজন খেলোয়াড়ও থাকছেন তাদের দলে।
সব মিলিয়ে কাগজে-কলমে এবারের শ্রীলঙ্কাকে বেশ শক্তিশালী মনে হচ্ছে। দলটির সামর্থ্য বিবেচনায় তাদের সাফের অন্যতম সম্ভাবনাময় দল হিসেবে দেখছেন অনেকে। তাই আগেভাগে লঙ্কানদের হারানো সহজ হবে—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি হতে পারে বড় পরীক্ষা।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। একদিকে ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে আসা লঙ্কান ফুটবলাররা, অন্যদিকে বাংলাদেশের দল, যেখানে প্রবাসী ফুটবলারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম হামজা চৌধুরী।
ইংলিশ ফুটবলে খেলা হামজা বাংলাদেশের জন্য বড় শক্তি। তবে বাকি প্রবাসী ফুটবলারদের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য নিয়ে তুলনা করলে শ্রীলঙ্কার দলটি কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকতে পারে।
এদিকে ভুটানও নিজেদের স্থানীয় ফুটবলারদের নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের প্রস্তুতিও কম নয়। ফলে সাফে বাংলাদেশের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহজ হবে না।
বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। টুর্নামেন্টের আগে মাত্র ১০ থেকে ১১ দিনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে হচ্ছে দলকে। এর আগে ইন্দোনেশিয়ায় ফিফা আসিয়ান কাপের ম্যাচে বাংলাদেশের ৯-২ গোলের হার সমর্থকদের হতাশ করেছে।
সেই বড় পরাজয়ের পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হয়ে উঠছে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের মঞ্চ। বাংলাদেশ কি আগের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? নাকি প্রস্তুতির ঘাটতি আবারও বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
তবে এবারের সাফে বাংলাদেশের সামনে শিরোপা জয়ের একটি বড় সুযোগও রয়েছে। শক্তিশালী দল নিয়ে ভারত অংশ নিচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেপালও নেই। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে।
কিন্তু সুযোগ থাকলেই শিরোপা পাওয়া যায় না। মাঠের পারফরম্যান্স, দলের সমন্বয়, কৌশল এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কে হবে চ্যাম্পিয়ন।
শ্রীলঙ্কা এবার আসছে ইউরোপীয় ফুটবলের অভিজ্ঞতা নিয়ে। বাংলাদেশকে তাই শুধু নামের ওপর নির্ভর করে প্রতিপক্ষকে বিচার করলে চলবে না। সাফের মাঠেই প্রমাণ হবে, লঙ্কানদের নতুন শক্তি কতটা কার্যকর, আর বাংলাদেশ নিজেদের হতাশা কাটিয়ে কতটা এগোতে পারে।
এবারের সাফ তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু শিরোপার লড়াই নয়—এটি নিজেদের সামর্থ্য ও প্রস্তুতিরও পরীক্ষা।
