রাজধানীর মিরপুরে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে আবারও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন গলি দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে সড়কে নামার চেষ্টা করছেন শ্রমিকেরা। তাদের সরিয়ে দিতে ধাওয়া দেওয়ার পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করেছে পুলিশ।
সোমবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় একটি গলি দিয়ে শ্রমিকদের একটি দল মূল সড়কে ওঠার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে কয়েকটি কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। পরে শ্রমিকেরা সেখান থেকে সরে যান।
এর কিছুক্ষণ পর মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশের প্রশিকা মোড় এলাকাতেও শ্রমিকদের সড়কে ওঠার চেষ্টা করতে দেখা যায়। পুলিশ তাদের বাধা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রূপনগর এলাকা থেকে ছোট ছোট দলে শ্রমিকেরা মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রশিকা মোড়ের দিকে আসছিলেন। তারা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
টানা দুই দিনের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর সোমবার সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সকাল থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন থাকতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গোলচত্বরে প্রস্তুত রাখা হয়েছে দাঙ্গা দমনের যানবাহন ও জলকামান।
তবে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মিরপুর-১০ নম্বর ও আশপাশের সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। পথচারী ও সাধারণ মানুষও নির্বিঘ্নে চলাচল করছিলেন।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার সকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তর বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম।
তিনি জানান, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করার পরিকল্পনায় জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রোববারের সংঘর্ষ এবং পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। এ জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, গতকালের সংঘর্ষে শুধু শ্রমিকেরা জড়িত ছিলেন, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তে শ্রমিকদের পাশাপাশি অন্য অপরাধীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সামনে এসেছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোববারের ঘটনায় বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান মহিদুল ইসলাম। তবে সোমবার সকাল পর্যন্ত নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বিভিন্ন স্থানে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মূল দাবি হচ্ছে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ।
এই দাবিতে রোববার সকাল থেকেই মিরপুর-১০ নম্বর মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। সকাল আটটার দিকে তারা সড়কে অবস্থান নিলে আশপাশের এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। অন্যদিকে শ্রমিকদের একটি অংশ বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত চলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া।
একপর্যায়ে দুপুরের দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ এবং পল্লবী মেট্রোস্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সকাল ১১টা ৩৮ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত স্টেশনগুলোতে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
এর আগের দিন শনিবারও একই দাবিতে মিরপুর এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকেরা। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
দুই দিনের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ এবং সোমবারের নতুন করে সড়কে নামার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে মিরপুর এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, পুলিশের অবস্থান এবং আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
মিরপুরের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও শ্রমিক আন্দোলনের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ জানতে চোখ রাখুন আমাদের প্রতিবেদনে।
