জাপান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরকে ঘিরে সেই প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছে। এই সফরকে শুধু কয়েকটি চুক্তি কিংবা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করা। এজন্য প্রয়োজন নতুন কর্মসংস্থান, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, শিল্পের বিকাশ এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবকাঠামো। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় কোনো এক পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াও জরুরি।
এ ক্ষেত্রে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে সহযোগিতা থেকে শুরু করে মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বড় প্রকল্পে জাপানের অংশগ্রহণ রয়েছে।
জাপানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় প্রস্তাবিত ‘বিগ-বি’ উদ্যোগও বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও শিল্পায়ন বাড়ানোই এ ধরনের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শুল্ক ব্যবস্থার জটিলতা কমানো, ব্যবসায়িক অনুমোদন সহজ করা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো জরুরি।
জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার অর্থ চীনের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা নয়। বাংলাদেশের অবকাঠামো, শিল্প ও জ্বালানি খাতে চীনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অবকাঠামো যত উন্নত হবে, তত বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। জাপানের উন্নত প্রযুক্তি, চীনের শিল্প ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারে। অর্থাৎ বিনিয়োগের উৎস যাই হোক, তার সুফল যেন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন করে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছে। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাই মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
একটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উচিত নয়। বরং দুই দেশের জনগণের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতেই সম্পর্ক পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সামনে পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া।
নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগের নামে অপ্রয়োজনীয় ঋণ বা প্রকল্পের বোঝা না বাড়িয়ে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রতিটি চুক্তিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জাপানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক—এই তিনটি ক্ষেত্রেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে। বিদেশি বিনিয়োগ যদি কর্মসংস্থান বাড়ায়, শিল্পের বিকাশ ঘটায় এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে, তাহলেই বাংলাদেশের জন্য সত্যিকারের নতুন ভোরের সূ
