বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের ডিজিটাল সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রাথমিকভাবে এটিকে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিন্যান্স জানায়, হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের প্রায় অর্ধেক জব্দ করতে সক্ষম হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চুরি হওয়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ এখনো হামলাকারীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গ্রাহকদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রকৌশলীর ল্যাপটপ থেকে হামলার সূত্রপাত?
প্রাথমিক তদন্তে একটি প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হামলাকারীরা অননুমোদিতভাবে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পায়। তবে হামলার সম্পূর্ণ কৌশল ও দায়ীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, এ ঘটনার সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট ‘ট্রেডারট্রেইটর’ নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠীর যোগসূত্র থাকতে পারে। তাদের মূল্যায়ন সঠিক হলে, ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের হ্যাকিংয়ের ঘটনাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে এই হামলা।
টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, বিন্যান্সে হামলার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট অতীতের সাইবার হামলার মিল রয়েছে। এর মধ্যে বাইবিটে সংঘটিত হ্যাকিংয়ের ঘটনাও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক নীতিবিষয়ক প্রধান অ্যারি রেডবোর্ডের মতে, এই ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। চুরি হওয়া বিপুল সম্পদের সন্ধান ও উদ্ধারে সংশ্লিষ্টদের আরও দীর্ঘ সময় কাজ করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসও এ ঘটনার সঙ্গে উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী বলে জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণাপ্রধান এরিক জার্ডিন অন্যান্য ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা
হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি বিন্যান্স। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, হামলাকারীদের শনাক্ত করা এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
ঘটনাটি বিন্যান্স ডটকমের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের সেবা দেওয়া আলাদা প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স ইউএস জানিয়েছে, এ ঘটনায় তাদের কার্যক্রম প্রভাবিত হয়নি।
টেথার ও সার্কেলের উদ্যোগে বিপুল সম্পদ জব্দ
হামলার পর চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে। বিন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ই হে সম্পদ জব্দে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
তিনি জানান, প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এদিকে, স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার ও সার্কেল জানিয়েছে, বিন্যান্সে সম্ভাব্য হ্যাকিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ সম্পদ তারা জব্দ করেছে।
সার্কেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেরেমি অ্যালেয়ার জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ৮০ কোটির বেশি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন ডলারের সঙ্গে মূল্যসংযুক্ত ইউএসডিসি স্টেবলকয়েনের অন্যতম প্রধান ইস্যুকারী।
অন্যদিকে, টেথারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পাওলো আরদোইনো জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। টেথার ইউএসডিটি স্টেবলকয়েন ইস্যু করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়ালও চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছে।
এ ছাড়া ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস জানিয়েছে, তাদের কার্যক্রমে এ ঘটনার কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
হ্যাকিংয়ের খবরে দরপতন বিটকয়েনের
বিন্যান্স আনুষ্ঠানিকভাবে নিরাপত্তা সমস্যার কথা জানানোর আগেই ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে সম্ভাব্য হ্যাকিং নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিন্যান্স বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম। বিশ্বজুড়ে এর নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০ কোটির বেশি বলে ধারণা করা হয়। বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির মধ্যেও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
হ্যাকিংয়ের খবর প্রকাশের পর বিটকয়েনের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। একই সময়ে ইথেরিয়াম ও সোলানাসহ অন্যান্য প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সির দামেও পতন দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা, ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
