বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান মেটার গিটহাব রিপোজিটরিতে অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ব্যক্তির তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সফটওয়্যারের সোর্স কোড এবং কিছু ব্যক্তিগত তথ্যের নাগাল পেয়েছে। তবে মেটা জানিয়েছে, এ ঘটনার মাধ্যমে তাদের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক বা মূল সিস্টেমে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ আগে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়টি শনাক্ত করা হয়। মেটার এক কর্মীর চুরি হওয়া লগইন তথ্য কাজে লাগিয়ে একটি বহিরাগত গোষ্ঠী গিটহাবে সংরক্ষিত কয়েকটি রিপোজিটরিতে প্রবেশ করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত মেটার কর্মী। গত মঙ্গলবার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ বিষয়ে অবহিত করা শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গিটহাব মূলত সফটওয়্যার নির্মাতাদের জন্য ব্যবহৃত একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এখানে বিভিন্ন সফটওয়্যারের সোর্স কোড সংরক্ষণ, পরিবর্তন এবং একাধিক ডেভেলপারের সমন্বয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। মেটার দাবি, অনুপ্রবেশকারীরা এই প্ল্যাটফর্মে থাকা কোম্পানির ব্যবসায়িক তথ্য ও বিভিন্ন পণ্যের সফটওয়্যার কোডে প্রবেশ করেছে।

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সিকিউরিটিওয়িককে দেওয়া তথ্যে মেটা জানিয়েছে, চুরি হওয়া উপাত্তের প্রায় ৯৯ শতাংশ ছিল ব্যবসায়িক তথ্য ও সফটওয়্যারের সোর্স কোড। বাকি প্রায় ১ শতাংশের মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত তথ্য।

ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে গিটহাবে গেল?

মেটার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গিটহাবে ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করার কথা নয়। কিন্তু ভুলবশত কয়েকটি রিপোজিটরিতে এ ধরনের তথ্য রাখা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তানীতির সঙ্গে বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

তবে ফাঁস হওয়া তথ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ কৃত্রিমভাবে তৈরি অথবা পরিচয় গোপন রেখে পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত উপাত্ত বলে জানিয়েছে মেটা। সফটওয়্যার তৈরি ও পরীক্ষার সময় ডেভেলপাররা এ ধরনের তথ্য ব্যবহার করে থাকেন। ফলে প্রকৃত ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে পরীক্ষামূলক তথ্য মিশে থাকায় কোনটি আসল, তা শনাক্ত করা হ্যাকারদের জন্য কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রাথমিক তদন্তে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে হ্যাকাররা বিশেষভাবে মেটার তথ্য চুরির উদ্দেশ্যেই এই অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মীর লগইন তথ্য ব্যবহার করে অনুপ্রবেশ

মেটার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, কোনো পণ্যের সফটওয়্যারে নিরাপত্তাত্রুটি থাকার কারণে এ ঘটনা ঘটেনি। বরং একজন কর্মীর চুরি হওয়া লগইন তথ্য ব্যবহার করে গিটহাবে প্রবেশ করা হয়েছিল। এর ফলে সীমিতসংখ্যক ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি ব্যবসায়িক উপাত্তও অননুমোদিত ব্যক্তিদের নাগালে চলে যায়।

ঘটনাটি শনাক্ত হওয়ার পরপরই অনুপ্রবেশকারীদের প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করে দেয় মেটার নিরাপত্তা দল। একই সঙ্গে গিটহাবের নিরাপত্তা বিভাগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত শুরু করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ

তথ্য ফাঁসের ঘটনায় সম্ভাব্য পরিচয় চুরি ও ফিশিং হামলার ঝুঁকি কমাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে ক্রেডিট পর্যবেক্ষণ এবং ডার্ক ওয়েব পর্যবেক্ষণ সেবা দেওয়ার কথা জানিয়েছে মেটা। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা পরিচয় চুরির সম্ভাব্য লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব।

এ ছাড়া গিটহাবে সংরক্ষিত সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা বাড়াতে প্রয়োজনীয় গোপন সংকেত ও প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য যাতে ভবিষ্যতে ভুলবশত রিপোজিটরিতে জমা না হয়, সে জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে।

মেটা আরও জানিয়েছে, গিটহাবের সঙ্গে সমন্বয় করে রিপোজিটরিগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় নজরদারির ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে ভুল করে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য আপলোড করা হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

সব মিলিয়ে, এই ঘটনা আবারও দেখিয়েছে যে কর্মীদের লগইন তথ্য চুরি হলেও তৃতীয় পক্ষের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রাখা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মেটার অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে সরাসরি অনুপ্রবেশ না ঘটলেও সোর্স কোড ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটিকে এখন অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং ফাঁস হওয়া তথ্যের সম্ভাব্য অপব্যবহার সম্পর্কে পরবর্তী তথ্যের দিকে নজর থাকবে প্রযুক্তি খাতের।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version