দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে কনফিডেন্স পাওয়ার। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এ অর্থের একটি অংশ সংগ্রহ করা হবে পুঁজিবাজার থেকে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকা উত্তোলনের পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির।
বর্তমানে জ্বালানি তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কনফিডেন্স পাওয়ার। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে কোম্পানিটির অংশগ্রহণ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ
কনফিডেন্স পাওয়ারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কক্সবাজার ও বাগেরহাটে দুটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। প্রতিটি কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা হবে ১০০ মেগাওয়াট। বাগেরহাটের মোংলায় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান ডরিন পাওয়ার অংশীদার হিসেবে যুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরও একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পে আনুমানিক ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। সব মিলিয়ে তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে কোম্পানিটি।
প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারে বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ার ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে ১৮ অক্টোবর বিনিয়োগকারীদের সামনে কোম্পানির পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম তুলে ধরতে একটি রোড শোর আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থের প্রায় ৮৩ শতাংশ ব্যয় হবে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণ এবং অবকাঠামো নির্মাণে। আরও ১৫ শতাংশ ব্যবহার করা হবে ঋণ পরিশোধে। অবশিষ্ট ২ শতাংশ ব্যয় হবে আইপিও-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর গুরুত্ব
বগুড়ায় কনফিডেন্স পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনকালে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ইমরান করিম জানান, দেশে গ্যাসের সংকট দ্রুত কাটবে—এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে আগামী দিনগুলোতেও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্রগুলোর প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। তবে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব বাড়ায় তাঁরাও এ খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ইমরান করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়াই তাঁদের নতুন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।
কনফিডেন্স পাওয়ারের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ৩৯৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলে রয়েছে ৩৩৯ মেগাওয়াট সক্ষমতা। চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির আরও একটি ৫৪ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।
কোম্পানিটির কার্যক্রম শুরু হয় প্রায় নয় বছর আগে। তবে কনফিডেন্স গ্রুপের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে সিমেন্ট খাতের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করে গ্রুপটি। প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পুরো কনফিডেন্স গ্রুপের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গ্রুপটির ২০টি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ।
সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য ১ হাজার মেগাওয়াট
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও করছে কনফিডেন্স পাওয়ার। কোম্পানিটি জানিয়েছে, নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের দরপত্রেও অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ২০২৯ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে চায় তারা। পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ২ হাজার মেগাওয়াটে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যাটারি খাতেও বিনিয়োগ রয়েছে। কোম্পানিটির মতে, দেশের জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চাহিদা বাড়লেও উৎপাদনে বাধা জ্বালানি সংকট
বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত একটি সেমিনারে ইমরান করিমের উপস্থাপিত নিবন্ধে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর ৬ শতাংশের বেশি হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির ঘাটতির কারণে সব কেন্দ্র থেকে পূর্ণ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। তবে গ্যাসের অভাবে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আরও প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্র বিভিন্ন সময়ে উৎপাদনের বাইরে থাকে।
ফলে মোট উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ওপর জ্বালানির অপর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ও প্রয়োজনীয় উৎপাদন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ইমরান করিম মনে করেন, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা সীমিত থাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগাতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার।
তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন, প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনায় অর্জিত অভিজ্ঞতা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নেও কাজে আসবে।
সব মিলিয়ে, প্রচলিত জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাইছে কনফিডেন্স পাওয়ার। পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে কোম্পানিটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও নতুন সংযোজন ঘটবে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ও চুক্তির শর্ত পূরণের ওপর।
