ব্রিটিশ অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী রাসেল ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে যুক্তরাজ্যে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে। এক নারী অভিযোগ করেছেন, ১৯৯৯ সালে লেবার পার্টির সম্মেলন চলাকালে একটি হোটেলকক্ষে ব্র্যান্ড তাকে ধর্ষণ করেন। আদালতে নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি অভিনেতার শরীর ও আচরণ সম্পর্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তবে ব্র্যান্ড তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে মামলার দ্বিতীয় দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পুলিশের কাছে ওই নারীর দেওয়া সাক্ষাৎকারের একটি রেকর্ডিং আদালতে শোনানো হয়। সেখানে তিনি কথিত ঘটনার আগে ও পরের পরিস্থিতি এবং হোটেলকক্ষে তার অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমদিকে রাসেল ব্র্যান্ডকে সমকামী বলে মনে করেছিলেন। এ কারণে তার সঙ্গে হোটেলকক্ষে কথা বলতে তিনি নিরাপদ বোধ করেছিলেন। কিন্তু বাথরুম থেকে ফিরে ব্র্যান্ডকে প্রায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় দেখে তিনি বিস্মিত ও অস্বস্তিতে পড়ে যান।
ওই নারী পুলিশের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্র্যান্ডের শরীরকে ‘সাপের মতো’ এবং ঘৃণ্য বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, সেই পরিস্থিতিতে তার মধ্যে তীব্র অস্বস্তি ও বমি বমি ভাব তৈরি হয়েছিল।
হোটেলকক্ষে কী ঘটেছিল বলে অভিযোগ?
আদালতে দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, ওই নারী ব্র্যান্ডকে কফি তৈরি করতে বলার পর বাথরুমে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি দেখতে পান, ব্র্যান্ডের পরনে কেবল ছোট অন্তর্বাস রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, অভিনেতা তখন ঘরের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছিলেন এবং একপর্যায়ে বিছানায় বসেন।
ওই নারীর অভিযোগ, এরপর ব্র্যান্ড তাকে নিজের খালি গায়ের ছবি তুলতে বলেন। পরে তাকে বিছানায় ধাক্কা দিয়ে শুইয়ে পোশাক খুলে ফেলেন। তিনি বাধা দেওয়ার এবং চুমু খাওয়া থেকে ব্র্যান্ডকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিলেন বলে আদালতে জানান।
পুলিশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই নারী বলেন, ব্র্যান্ড তার ওপর শুয়ে পড়েছিলেন এবং তার ওজনের কারণে তিনি চাপ অনুভব করছিলেন। তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন।
তার আরও দাবি, একপর্যায়ে ব্র্যান্ড তার মুখের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে দেন, যার ফলে শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছিল। অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি যৌন সম্পর্কে সম্মতি দেননি এবং তার আপত্তি সত্ত্বেও কথিত ঘটনাটি ঘটে।
আদালতে ওই নারী আরও জানান, ঘটনার সময় ব্র্যান্ড তাকে বারবার ‘উপভোগ করো’ বলে বলছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলেন, যা তিনি চাননি এবং উপভোগও করছিলেন না।
অভিযোগকারীর দাবি, কথিত ঘটনার পর তিনি দীর্ঘ সময় বাথরুমে কাটান এবং নিজেকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। সেই সময় তিনি আতঙ্কিত ও অসহায় বোধ করছিলেন বলে আদালতে জানান।
ব্র্যান্ডের প্রতি আকর্ষণের দাবি অস্বীকার
শুনানিতে রাসেল ব্র্যান্ডের আইনজীবী ইয়ান উইন্টার অভিযোগকারীকে জেরা করেন। জেরার একপর্যায়ে আইনজীবী দাবি করেন, ব্র্যান্ডের ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়েছিলেন ওই নারী।
তবে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন অভিযোগকারী। তিনি বলেন, ব্র্যান্ডের প্রতি তার কোনো বিশেষ আকর্ষণ ছিল না এবং তিনি তাকে আকর্ষণীয় বলেও মনে করেননি। বরং ব্র্যান্ডকে সমকামী মনে করেছিলেন বলেই তার সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করেছিলেন বলে জানান তিনি।
অভিযোগকারী আরও বলেন, ব্র্যান্ডকে হোটেলকক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়ার জন্য পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকেই দায়ী মনে করেছিলেন। তবে তার বক্তব্য অনুযায়ী, হোটেলকক্ষটি ছিল তার অফিস ও কাজের জায়গা। সেখানে তার ব্যক্তিগত পরিসর লঙ্ঘন করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বিচার চলাকালে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ওই নারী। তিনি আদালতে দাবি করেন, ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে তার সম্মতি ছিল না এবং ঘটনার সময় তিনি তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
সাতটি অভিযোগে চলছে বিচার
৫১ বছর বয়সী রাসেল ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগে বিচার চলছে। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি ধর্ষণ, তিনটি যৌন নিপীড়ন এবং একটি অশালীন আচরণের অভিযোগ। অভিযোগগুলো ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ছয় নারীর সঙ্গে সংঘটিত কথিত ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
মামলার প্রথম দিনের শুনানিতে কৌঁসুলিরা ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড নিজের প্রভাব ও ব্যক্তিত্ব ব্যবহার করে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, ব্র্যান্ড তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
বর্তমানে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলমান। আদালতে অভিযোগকারীর সাক্ষ্য, পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্য এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে ঘটনাগুলোর বিভিন্ন দিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।
মনে রাখতে হবে: আদালতে উত্থাপিত অভিযোগ এবং প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাসেল ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা উচিত।

