ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভোটার তালিকায় অনিয়ম ও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র নেতারা। বৈঠক শেষে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী দাবি করেছেন, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ শুনে রাষ্ট্রপতি তা সরাসরি নাকচ করেননি। বরং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

রাহুল গান্ধীর এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি ভবনের পক্ষ থেকে বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি ভবনের সূত্র রাহুলের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে এ ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে জড়ানো দুঃখজনক।

বৈঠক শেষে রাহুল গান্ধী বলেন, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের পক্ষে বিরোধীদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। তাঁর দাবি, দেশের মানুষও এসব অনিয়মের বিষয় দেখেছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি বিরোধীদের

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের আগে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ও নেতারা সংসদ ভবন থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের উদ্দেশে মিছিল করেন। পরে বিরোধীদের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগসহ নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি তোলা হয়।

বৈঠক শেষে রাহুল গান্ধী জানান, আগামী সোমবার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা রয়েছে বিরোধী নেতাদের। এ সময় নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ ও তাদের দাবিগুলো তুলে ধরে একটি স্মারকলিপি দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

স্মারকলিপিতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি

রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে বিরোধী জোট চারটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছে।

প্রথমত, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ২০২৩ সালে প্রণীত নির্বাচন কমিশনার নিয়োগসংক্রান্ত আইন বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ওই আইনের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দায়মুক্তির সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম বন্ধের দাবি তুলেছে বিরোধীরা। তাদের দাবি, তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ১৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তৃতীয়ত, দেশের সব নির্বাচনে কাগজের ব্যালট পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী জোট।

চতুর্থত, গত দুই বছরে যেসব বিধানসভা নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তারা দাবি করছে, সেসব নির্বাচন বাতিলের দাবিও স্মারকলিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

‘জ্ঞানেশ, তোমার খেলা শেষ’ স্লোগানে প্রতিবাদ

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে বিরোধী নেতাদের একটি ছোট প্রতিনিধি দল অংশ নিলেও অন্য নেতারা কর্তব্যপথে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘জ্ঞানেশ, তোমার খেলা শেষ’।

এ সময় নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের সঙ্গে কমিশনের কথিত যোগসাজশের অভিযোগ তুলে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।

বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

রাষ্ট্রপতি ভবনকে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ানোর অভিযোগ বিজেপির

বিরোধীদের কর্মসূচির সমালোচনা করেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দলটির মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী অভিযোগ করেন, কংগ্রেস রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির দপ্তরকে বিতর্কের মধ্যে নিয়ে এসেছে।

তাঁর দাবি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বিতর্কিত বক্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে কংগ্রেস। রাষ্ট্রপতি ভবনের বাইরে বিরোধীদের কর্মসূচি এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হচ্ছে। বিরোধী জোট নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে, বিজেপি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে বৈঠক নিয়ে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য এবং রাষ্ট্রপতি ভবনের সূত্রের পাল্টা অবস্থানের পর বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version