যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখছেন—এমন হাজারো বিদেশি প্রযুক্তিকর্মীর জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতির অংশ হিসেবে কয়েকটি বড় প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানের গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবীরা।

মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনিয়ম রোধ করা এবং স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান ও মজুরি সুরক্ষিত রাখাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। তবে সিদ্ধান্তটির বাস্তব প্রভাব নিয়ে প্রযুক্তি খাতের কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী কর্মভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের পরিকল্পনা নতুন করে বাধার মুখে পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাডোবি, কগনিজেন্ট, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনিসহ আটটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন বা পিইআরএম কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার আওতায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন আবেদন গ্রহণ এবং আগে জমা দেওয়া আবেদন প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

পিইআরএম যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মীকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য স্পন্সর করতে চাইলে সাধারণত প্রথমে প্রমাণ করতে হয়, সংশ্লিষ্ট পদে উপযুক্ত মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে স্থানীয় কর্মীদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

ফলে এই প্রক্রিয়া বন্ধ বা দীর্ঘায়িত হলে বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে পিইআরএম আবেদন স্থগিত হওয়া আর কারও বর্তমান কর্মভিসা বাতিল হওয়া এক বিষয় নয়। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের এইচ-১বি ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তের কথা এখানে বলা হচ্ছে না।

কেন উদ্বেগে ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীরা?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে ভারতীয় পেশাজীবীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তাঁদের অনেকে এইচ-১বি ভিসায় দেশটিতে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে নিয়োগকর্তার সহায়তায় গ্রিন কার্ডের আবেদন করে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা করেন।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পিইআরএম স্থগিত থাকলে তাঁদের অপেক্ষার সময় আরও বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন অস্থায়ী অভিবাসন-অবস্থায় থাকার কারণে চাকরি পরিবর্তন, পারিবারিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ বসবাসের সিদ্ধান্তেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রত্যেক কর্মীর ক্ষেত্রে প্রভাব এক রকম হবে না; তাঁদের বর্তমান অভিবাসন-অবস্থা, আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী সরকারি নির্দেশনার ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে।

মার্কিন প্রশাসন বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মীদের চাকরি থেকে সরিয়ে একই ধরনের কাজে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভিসাব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান ও মজুরির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

মাইক্রোসফটকে ঘিরেও এ ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ভ্যান্সের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন কর্মী ছাঁটাইয়ের পর বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য ভিসা ও স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশনের আবেদন করেছে। তবে এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের আপত্তির একটি জায়গা হলো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও স্থানীয় প্রার্থী খোঁজার প্রক্রিয়া। ভ্যান্সের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান এমনভাবে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করে, যাতে যোগ্য মার্কিন প্রার্থী পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা সম্ভব হয়। প্রশাসনের মতে, এ ধরনের চর্চা বন্ধ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা খাতেও বাড়ছে নজরদারি

শুধু প্রযুক্তি কোম্পানি নয়, বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত কিছু কর্মসূচিও প্রশাসনের নজরে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জে-১ বিনিময়-ভিজিটর ভিসার আওতায় বিদেশি গবেষকদের স্পন্সর করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম তদন্তের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রশাসনের অভিযোগ, বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়োগের কারণে কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন স্নাতক ও গবেষকদের কর্মসংস্থান এবং মজুরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে বিদেশি শিক্ষার্থী বা গবেষকদের উপস্থিতিই যে স্থানীয় কর্মীদের মজুরি কমার কারণ, তা সর্বক্ষেত্রে প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্তের ফলাফল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

পিইআরএম ও এইচ-১বি ভিসার পার্থক্য কোথায়?

এইচ-১বি হলো বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের জন্য একটি অস্থায়ী কর্মভিসা। অন্যদিকে, পিইআরএম হচ্ছে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের আবেদন এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া।

দুটি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য আলাদা হওয়ায় পিইআরএম স্থগিতের অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব বিদেশি কর্মীর কর্মভিসা বাতিল হয়ে গেছে। তবে স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি হলে কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

২০০৫ সালে চালু হওয়া পিইআরএম ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন শ্রম বিভাগ যাচাই করে, বিদেশি কর্মীকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় শ্রমবাজারের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করা হচ্ছে কি না। এই প্রক্রিয়া শুরু করার দায়িত্ব সাধারণত নিয়োগকর্তার। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে শ্রম সার্টিফিকেশন পরবর্তী অভিবাসন প্রক্রিয়ার পথ খুলে দিতে পারে। তবে সার্টিফিকেশন পেলেই সরাসরি গ্রিন কার্ড নিশ্চিত হয় না; এর পরেও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়।

কিছু বিদেশি কর্মীর জন্য নিয়োগকর্তার স্পন্সরশিপ ছাড়াও নির্দিষ্ট শর্তে নিজ উদ্যোগে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ইবি-১এ এবং জাতীয় স্বার্থে ছাড়ের ভিত্তিতে ইবি-২ এনআইডব্লিউ আবেদন উল্লেখযোগ্য। তবে এসব পথ সবার জন্য প্রযোজ্য নয় এবং যোগ্যতা, আবেদন নিষ্পত্তির সময় ও ভিসা প্রাপ্যতার ওপর ফলাফল নির্ভর করে।

ভারতীয় প্রযুক্তি খাতের অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কতটা প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠন নাসকমের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে। তাদের মতে, দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক চলাচল এবং স্থায়ী অভিবাসনকে একই বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। স্বল্পমেয়াদি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে এইচ-১বি কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলেও সংগঠনটি মনে করে।

ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে বলে নাসকমের দাবি। তাই অভিবাসননীতিতে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব শুধু ভারতীয় কর্মীদের ওপর নয়, বরং নিয়োগকর্তা ও প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমেও পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন পদক্ষেপ বিদেশি কর্মী নিয়োগ ও স্থায়ী বসবাসের নীতিতে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সিদ্ধান্তটির চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে স্থগিতাদেশের সুনির্দিষ্ট পরিধি, সরকারি নির্দেশনা, আইনি পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

হাজারো ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীর জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের যে পরিকল্পনা নিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এগোচ্ছেন, সেই পথ কি আরও দীর্ঘ হবে? নাকি পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে? এর উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট নীতির বাস্তবায়ন ও পরবর্তী পদক্ষেপ স্পষ্ট হওয়ার পর।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version