ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান বহর। গত আট মাসে সংঘাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৮১টি মার্কিন যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সামরিক উড়োজাহাজের সম্মিলিত আর্থিক মূল্য প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের গবেষণা ও বিশ্লেষণী সংস্থা কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের (সিআরএস) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদনটি কংগ্রেসে জমা দেওয়া হয়।
সিআরএসের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া সামরিক উড়োজাহাজের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান, ড্রোন এবং হেলিকপ্টার।
তালিকায় ১২টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল, একটি এফ-৩৫ লাইটনিং-২ এবং দুটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ অ্যাটাক এয়ারক্রাফট রয়েছে।
এর মধ্যে গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর ভুল হামলা বা ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর ঘটনায় তিনটি এফ-১৫ই বিমান ভূপাতিত হয়। পরবর্তী সময়ে এপ্রিল মাসে ইরানের আকাশে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময় আরও একটি এফ-১৫ই ধ্বংস হয়।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে ইরানের হামলার সময় আরও আটটি এফ-১৫ই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে সিআরএস। তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
ক্ষতিগ্রস্ত এফ-৩৫ও ফিরেছে বহরে
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর অন্যতম এফ-৩৫এ-ও ইরানের হামলায় ক্ষতির শিকার হয়েছে। সিআরএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ মার্চ ইরানের হামলার সময় একটি এফ-৩৫এ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে মেরামতের মাধ্যমে বিমানটিকে আবার সামরিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে মার্কিন বিমান বহরের ক্ষতির বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে ড্রোন। সিআরএসের সর্বশেষ তালিকায় অন্তত ৪৫টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের তথ্য রয়েছে।
এমকিউ-৯ রিপার মূলত দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করে নজরদারি চালানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হয়। বিপুল সংখ্যক রিপার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মার্কিন বিমানবাহিনীর ড্রোন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির ফলে মে মাসের মধ্যে মার্কিন বিমানবাহিনীর এমকিউ-৯ বহর ১৩৫টিতে নেমে আসে। অথচ একই সময়ে মার্কিন বাহিনীর প্রয়োজন ছিল অন্তত ১৮৯টি মোতায়েনযোগ্য রিপার ড্রোন।
তালিকায় আরও যেসব সামরিক উড়োজাহাজ
সিআরএসের তালিকায় শুধু যুদ্ধবিমান বা ড্রোন নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সামরিক উড়োজাহাজের নামও রয়েছে।
এর মধ্যে সাতটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার রয়েছে, যেগুলো আকাশে থাকা যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি একটি ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান এবং দুটি এমসি-১৩০জে কমান্ডো-২ বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী বিমানও ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় রয়েছে।
এ ছাড়া একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন-২ যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার, একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন এবং তিনটি এমকিউ-১ ড্রোনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য দেওয়া হয়েছে।
তালিকায় রয়েছে একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার, চারটি এএইচ-৬ লিটল বার্ড হালকা আক্রমণকারী হেলিকপ্টার এবং একটি এমএইচ-৬০ সিহক হেলিকপ্টারও।
ই-৩ সেন্ট্রির ক্ষতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
মার্কিন সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ই-৩ সেন্ট্রি বিমানের ক্ষতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এই বিমান শুধু আকাশ পর্যবেক্ষণই করে না, একই সঙ্গে কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও কাজ করে।
বোয়িং ৭০৭ বিমানের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ই-৩ সেন্ট্রি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন বিমানবাহিনীর আকাশ নজরদারি ও যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এ ধরনের বিমান মার্কিন বহরে সংখ্যায় খুব বেশি নেই। ফলে একটি বিমানও হারানো বা দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়া সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আগের হিসাবের তুলনায় ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে
সিআরএসের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, মোট ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া সামরিক উড়োজাহাজের সংখ্যা ৮১। এর আগে মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংস্করণে এই সংখ্যা ছিল ৪২।
তবে নতুন সংখ্যাটি আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হলেও এর অর্থ এই নয় যে মে মাসের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন করে ৩৯টি বিমান ধ্বংস হয়েছে।
সিআরএস জানিয়েছে, নতুন তথ্য হাতে আসা এবং আগে প্রকাশ্যে না আসা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা শনাক্ত হওয়ার কারণে তাদের তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। ভবিষ্যতে আরও তথ্য পাওয়া গেলে এই সংখ্যাও পরিবর্তিত হতে পারে।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ থেকে নতুন উত্তেজনা
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। প্রায় সাড়ে তিন মাসের সামরিক তৎপরতার পর জুনের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযানটির সমাপ্তির ঘোষণা দেন।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই অভিযান শেষ হওয়ার ঘোষণা এলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন পর্যায়ে দুই পক্ষ একে অপরকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এরপর গত আগস্টে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করে। এর পর সামরিক হামলায় কিছুটা বিরতি দেখা গেলেও তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির সামান্য অবনতি হলেও দুই দেশের মধ্যে আবারও সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে। আর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান ও ড্রোন বহরের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

