অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজস্ব আদায় এবং ঋণের শর্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের আলোচনা এখনও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছায়নি। কঠোর কিছু শর্ত বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে পার্থক্য থাকায় নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা জটিল হয়ে উঠেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে এসে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন একটি ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা চলছে।

রোববার (৪ অক্টোবর) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আইএমএফ কিংবা বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিতে গিয়ে দেশের স্বার্থের পরিপন্থী কঠিন শর্ত মেনে নেওয়া হবে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগের আইএমএফ কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে, কারণ ওই কর্মসূচির কিছু শর্ত সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময় আইএমএফের সঙ্গে প্রায় ৪৭০ কোটি ডলারের একটি ঋণ চুক্তি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ওই কর্মসূচির পরিমাণ বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি ডলারে নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় করা হয়েছিল।

তবে রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কারে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় পরবর্তী কিস্তিগুলো আটকে দেয় আইএমএফ। এরপর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের সময়ে পুরোনো কর্মসূচির পরিবর্তে বিকল্প ঋণ কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনজুরুল হক জানিয়েছেন, নতুন কর্মসূচির শর্তগুলো পর্যালোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বেশ কিছু সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, সরকারের বড় ধরনের রাজনৈতিক সমর্থন থাকায় রাজস্ব আদায় বাড়ানো, অভিন্ন ১৫ শতাংশ ভ্যাট ব্যবস্থা কার্যকর করা, বিভিন্ন করছাড় কমানো বা বাতিল এবং ব্যাংক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে সরকারের অবস্থান হলো, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে দেশের জনস্বার্থ এবং নির্বাচনি অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দিয়েই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বহুপক্ষীয় কোনো সংস্থার শর্ত দেশের স্বার্থ বা সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তা সরাসরি গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আইএমএফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা ছিল কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।

তিনি আরও মনে করেন, ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণ এবং খেলাপি ঋণ নির্ধারণের সময়সীমা পরিবর্তনের মতো বিষয় নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অক্ষুণ্ন রেখেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। আলোচনায় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংক খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। তার দাবি, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ পর্যন্ত হলেও এর পুরো চিত্র অতীতে প্রকাশ করা হয়নি। এখন সরকার কোনো চাপের কারণে নয়, নিজেদের উদ্যোগেই ব্যাংক খাতের পুনঃমূলধন এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।

সব মিলিয়ে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান। একদিকে ঋণ পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করেই শেষ পর্যন্ত চুক্তির কাঠামো নির্ধারিত হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version