দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির সরবরাহে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে এলপিজি আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বাজারে দেখা দিয়েছে ঘাটতি। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভোক্তাদের ওপর। কোথাও কোথাও ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে দুই হাজার টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
এলপিজি আমদানিকারক ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজি এসেছিল। সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ হাজার টন বা ২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম কমিয়েছিল বিইআরসি। ২ সেপ্টেম্বর ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা করা হয়। কিন্তু বাস্তব বাজারচিত্র একেবারেই ভিন্ন। সরবরাহ সংকটের কারণে অনেক এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থার অস্থিরতা বড় ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এলপিজির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে থাকায় এই পরিস্থিতির প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। বিকল্প পথে পণ্য আনার ক্ষেত্রে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বেড়েছে।
আমদানিকারকদের মতে, শুধু পরিবহন সংকট নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রয়োজনীয় কার্গো সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রেজা জানিয়েছেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া। কিছু সরবরাহকারী চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ পণ্যও দিতে পারছে না বলে তিনি জানান।
এদিকে এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবের সদস্যদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে কার্গো সংগ্রহের বাড়তি খরচ অনেক বেড়েছে। বিইআরসির মূল্য নির্ধারণের সময় যে প্রিমিয়াম ধরা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়ে কার্গো সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে আমদানিকারকদের লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে পণ্য কিনে দেশে নিয়ন্ত্রিত দামে বিক্রি করলে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজীম চৌধুরী জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাসে তাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। উৎপাদক পর্যায়ে সরবরাহের অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বাজারে গ্যাসের জোগান স্বাভাবিক রাখতে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। এর বড় অংশই বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। বাজারের প্রায় পুরো সরবরাহই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে বেসরকারি আমদানিতে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত খুচরা বাজারে পৌঁছে যায়।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত আমদানি কার্গো সময়মতো না পৌঁছানোয় বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক নৌপথের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এবং প্রয়োজনীয় কার্গো নিশ্চিত করা না গেলে অক্টোবরেও সংকটের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
অর্থাৎ, একদিকে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট, অন্যদিকে বাড়তি পরিবহন ও কার্গো সংগ্রহের ব্যয়—দুইয়ের চাপে দেশের এলপিজি বাজারে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। বিইআরসি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও বাজারের বাস্তব দামে দুই হাজার টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে অনেক ভোক্তাকে। সংকট দ্রুত না কাটলে সামনে এই চাপ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

