কক্সবাজারের রামুতে অর্থের বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একজনকে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

রামু উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ঠিকানা ব্যবহার করে নতুন ভোটার হওয়া অন্তত ১২ জনের তথ্য ও নথি পর্যালোচনায় এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কয়েকজন দাবি করেছেন, ভোটার তালিকায় স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে যাদের নাম রয়েছে, তাদের কাউকেই তারা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।

নথিতে দেখা যায়, খুনিয়াপালং, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, ঈদগড় ও গর্জনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করে এসব ব্যক্তিকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বয়সও ভিন্ন ভিন্ন—কারও বয়স ৬৬ বছর, আবার কারও বয়স ২২ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, খুনিয়াপালংয়ের পেঁচারদ্বীপ, দক্ষিণ মিঠাছড়ির বলিপাড়া, মোক্তার বাপেরপাড়া ও পূর্ব পানেরছড়া, ঈদগড়ের করলিয়ামোরা, ছগিরাকাটা, চরপাড়া ও নয়াপাড়া এবং গর্জনিয়ার ফকিরপাড়ার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কয়েকজন জানিয়েছেন, ভোটার তালিকায় থাকা এসব ব্যক্তিকে তারা আগে কখনো দেখেননি। তাদের অভিযোগ, জাল কাগজপত্র ও পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের স্থানীয় নাগরিক হিসেবে দেখিয়ে ভোটার তালিকায় যুক্ত করা হয়ে থাকতে পারে।

ঈদগড় ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন সিকদার এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য রাজা মিয়া, শফিকুল ইসলাম সোহেল ও শাকের আহমদ এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, রামুতে অবৈধ উপায়ে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রত্যেকের কাছ থেকে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় এবং এই অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রামু উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক নুর মোহাম্মদের নামও এসেছে। সূত্রগুলোর দাবি, আবেদনকারী সংগ্রহ থেকে শুরু করে কাগজপত্র প্রস্তুত ও ভোটার নিবন্ধনের বিভিন্ন ধাপে তিনি ভূমিকা রাখেন। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুর মোহাম্মদ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে সন্দেহজনক ভোটারদের জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, বাবা-মায়ের পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা এবং জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া প্রত্যয়নপত্র পুনরায় যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

রামু উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খালেদ শহীদ বলেন, অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার অভিযোগটি জাতীয় নিরাপত্তা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য গুরুতর বিষয়। তার মতে, এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে রামু উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার অভিযোগের বিষয়টি তার নজরে এসেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফলে রামুর ভোটার তালিকায় সন্দেহজনকভাবে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয়, কাগজপত্র এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে এখন তদন্তের ফলাফলের দিকেই নজর রয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version