আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা ১৯ মিনিটের দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ সেন্ট বা ০.০৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯.১৮ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩৫ সেন্ট বা ০.৩৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯০.১৭ ডলারে নেমে আসে।

এর আগে মঙ্গলবার দিনের লেনদেন শেষে ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের নিচে চলে আসে। ৮ সেপ্টেম্বরের পর এটাই ছিল প্রথমবার, যখন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে দিন শেষ করে।

তেলের বাজারে দামের এই পতনের পেছনে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি জানান, যুদ্ধের অবসান নিয়ে তার প্রতিনিধিরা ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাজনৈতিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমে না গেলেও আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আশাবাদ দেখা দিয়েছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাজার এখন তুলনামূলকভাবে বেশি আশাবাদী।

তার মতে, নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের বৈঠক দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। যদিও উভয় পক্ষের বক্তব্যে এখনও কঠোর অবস্থানের প্রকাশ রয়েছে, তবুও ব্যবসায়ীরা আলোচনার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।

এদিকে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যবস্থাতেও কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। মঙ্গলবার দেশটি লোহিত সাগরমুখী ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় চালু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সৌদি আরব ওই হামলার জন্য ইরাকের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দায়ী করেছিল। পাইপলাইন বন্ধ থাকায় ইয়ানবু বন্দরের দিকে অপরিশোধিত তেল পাঠানোও বাধাগ্রস্ত হয়।

হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার পর সৌদি আরবের জন্য ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করছে। পাইপলাইনটির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ইয়ানবু বন্দরের দিকে পাঠানোর সক্ষমতা রয়েছে। এই পরিমাণ বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশের সমান।

শুধু সৌদি আরব নয়, ইরাকও তেল রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ মঙ্গলবার জানান, বর্তমানে ইরাক প্রতিদিন ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করছে। তুরস্কের মাধ্যমে রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে দৈনিক ৬ লাখ ব্যারেলের বেশি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সা ও কেপলারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে ইরাকের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রতিদিন যথাক্রমে প্রায় ২৩ লাখ এবং ২১ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল। জুলাইয়ের তুলনায় এই রপ্তানি বেড়েছে। তবে সংঘাত শুরুর আগে ফেব্রুয়ারির তুলনায় ইরাকের তেল রপ্তানি এখনো কম রয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও অপরিশোধিত তেলের মজুত বৃদ্ধির তথ্য বাজারে এসেছে। শিল্প খাতের প্রাথমিক হিসাবে, ১৮ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল বেড়েছে।

তবে রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকেরা এর বিপরীতে তেলের মজুত কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ফলে সরকারি তথ্য প্রকাশের পর বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় দেশটির সাপ্তাহিক তেল মজুতের সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করার কথা রয়েছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহের কিছুটা উন্নতি, সৌদি আরবের বিকল্প পাইপলাইন চালু এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনা—এই কয়েকটি বিষয় বর্তমানে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version