নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় গত আগস্টে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে বলে নতুন এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় ওই অঞ্চলের ভূমি, বরফ ও পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে একটি জটিল প্রাকৃতিক ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

২০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে করা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট দূষণ কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ ধরনের বড় দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

গত আগস্টের শেষ দিকে নেপালের দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায় বিশাল আকারের শিলা ও বরফ ধসের ঘটনা ঘটে। এর প্রভাবে শহর, সড়ক ও সেতুসহ বিস্তীর্ণ এলাকার অবকাঠামো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অন্তত ১ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল বিপর্যয়?

প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট ল্যাংটাং লিরুং পর্বতের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে। প্রায় ২ হাজার ফুট প্রশস্ত শিলা ও হিমবাহের বরফের একটি বড় অংশ প্রায় ৭ হাজার ফুট নিচে থাকা নদীতে গিয়ে পড়ে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এত বড় ভর পাহাড় থেকে নদীতে আছড়ে পড়ায় যে পরিমাণ শক্তি সৃষ্টি হয়েছিল, তা রিখটার স্কেলে প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের শক্তির সঙ্গে তুলনীয়। আঘাতের তীব্রতায় বরফ দ্রুত গলে গিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি তৈরি হয়।

এরপর সেই পানির স্রোত পাহাড়ের ঢাল ও উপত্যকার বিভিন্ন স্তর থেকে আর্দ্র পলি ও অন্যান্য উপাদান সঙ্গে নিয়ে আরও ভারী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এটি উপত্যকার নিচে থাকা বরফের স্তরেও আঘাত করে। এর ফলে তৈরি হয় অত্যন্ত শক্তিশালী বন্যার ঢেউ।

এই ঢেউ ঘণ্টায় প্রচণ্ড গতিতে ২০ মাইলেরও বেশি পথ ভাটির দিকে অগ্রসর হয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট ইউনিভার্সিটির পর্বত জলবিজ্ঞানী ওয়াল্টার ইমারজিল ঘটনাটিকে হিমালয় অঞ্চলের অত্যন্ত ব্যতিক্রমী দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কোথায়?

চরম আবহাওয়ার ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণকারী ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর বিজ্ঞানী ও হিমবাহ বিশেষজ্ঞদের একটি দল এই বিপর্যয়ের বিভিন্ন কারণ নিয়ে গবেষণা করেছে। বুধবার প্রকাশিত তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঘটনাটি কোনো একটি প্রাকৃতিক কারণে ঘটেনি। বরং কয়েকটি প্রক্রিয়া পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপর্যয়ের মাত্রা বাড়িয়েছে।

গবেষকদের মতে, কয়েক দশক ধরে চলা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এসব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

২০১৫ সালের ভূমিকম্পের প্রভাব

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ২০১৫ সালের এপ্রিলে নেপালে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পও পাহাড়টির বর্তমান অস্থিতিশীলতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ওই ভূমিকম্পের সময় পাহাড়টির দক্ষিণ অংশে শিলা ও বরফের ধস নেমেছিল। এর ফলে পাহাড়ের ঢাল কিছুটা দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে ওই এলাকায় ভূমিধসের প্রবণতাও বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, প্রায় এক দশক আগে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প পাহাড়টির ভেতরের কাঠামোকে দুর্বল করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কারণ হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে।

গলছে পারমাফ্রস্ট, দুর্বল হচ্ছে পাহাড়

গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে পারমাফ্রস্টের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

পারমাফ্রস্ট হলো দীর্ঘ সময় ধরে জমাট থাকা মাটি, শিলা, বালি ও বরফের স্তর। এটি অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশকে একসঙ্গে ধরে রাখার মতো কাজ করে। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়লে এই জমাট স্তর গলতে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাফ্রস্ট দুর্বল হয়ে গেলে পাহাড়ের শিলার দৃঢ়তা কমে যায়। একই সঙ্গে গলিত পানি পাহাড়ের গভীর ফাটল দিয়ে প্রবেশ করতে পারে। এতে ঢালের ভেতরের স্থিতিশীলতা আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ওয়াল্টার ইমারজিলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পারমাফ্রস্ট গলে গেলে শিলার শক্তি কমে এবং ঢালের অভ্যন্তরে পানির প্রবেশ বাড়তে পারে।

হিমবাহের পরিবর্তনও বাড়িয়েছে ঝুঁকি

বিপর্যয়ের সঙ্গে ল্যাংটাং-লিরুং হিমবাহের পরিবর্তনেরও সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গত কয়েক দশকে এই হিমবাহের পুরুত্ব কমেছে এবং এর আকারও সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। হিমবাহের এই পরিবর্তন পাহাড়ের ঢালকে কম স্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

এ ছাড়া হিমবাহ গলে যে পানি তৈরি হয়, সেটিও পাহাড়ের শিলার ফাটলের ভেতরে ঢুকে কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হওয়া এই পরিবর্তনগুলো শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

অস্বাভাবিক তুষারপাত ও অতিরিক্ত তাপ

গবেষকরা বিপর্যয়ের আগের কয়েক মাসের আবহাওয়াও বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মতে, আগের বছরের অক্টোবরের শেষ এবং নভেম্বরের শুরুতে ওই অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি তুষারপাত হয়েছিল।

এরপর জুলাই ও আগস্টে ওই এলাকার তাপমাত্রা স্থানীয় পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে অত্যন্ত বেশি ছিল। অতিরিক্ত তাপের কারণে পাহাড় ও হিমবাহের বরফ দ্রুত গলে বিপুল পরিমাণ পানি তৈরি হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

এই অতিরিক্ত পানি পাহাড়ের দুর্বল অংশে প্রবেশ করে ধসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে থাকতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব

ঐতিহাসিক আবহাওয়া তথ্য ও জলবায়ু মডেল বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওই অঞ্চলে জুলাই ও আগস্টের তাপমাত্রা বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ।

শুধু ওই দুই মাস নয়, অঞ্চলটির বার্ষিক গড় তাপমাত্রাও প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এই বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড় উষ্ণায়নের তুলনায় বেশি।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটোর মতে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এই দুর্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

আগাম সতর্ক করা কেন কঠিন ছিল?

গবেষকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো—এটি ছিল অত্যন্ত জটিল একটি ধারাবাহি

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version