ইরানের একটি স্কুল ও ক্রীড়া স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের শামিল বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধানী মিশন।

জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন অন ইরানের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের মিনাব শহরের একটি বিদ্যালয় ও লামার্দ শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তদন্তকারীদের মতে, এসব হামলার ক্ষেত্রে বেসামরিক স্থাপনা ও মানুষের সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মিনাবের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার সঙ্গে মার্কিন বাহিনীর সম্পৃক্ততার যুক্তিসংগত ভিত্তি পেয়েছেন তদন্তকারীরা। প্রতিবেদনটি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সামনে উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।

তদন্তে বিদ্যালয়টিকে একটি সুস্পষ্ট বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্কুলটি কোনো সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল—এমন প্রমাণও তদন্তকারীরা পাননি।

ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন স্কুলশিক্ষার্থী ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, কিছু ইরানি কর্মকর্তার হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৭৫-এর কাছাকাছি হতে পারে এবং নিহতদের বড় অংশই শিশু।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরের ওই স্কুল ভবনে হামলাটি ঘটে। বিদ্যালয়ের কাছাকাছি থাকা একটি ইরানি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর সময় ভুলবশত স্কুল ভবনটি আঘাতপ্রাপ্ত হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

জানা গেছে, স্কুল ভবনটি অতীতে ওই সামরিক ঘাঁটির অংশ ছিল। তবে হামলার সময় সেটি বেসামরিক স্থাপনা হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছিল।

ঘটনাটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তেও হামলার দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড হামলার লক্ষ্য নির্ধারণের সময় ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করেছিল।

ওই তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়েছিল, স্কুল-সংলগ্ন স্থানে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সামরিক কমান্ডার অবস্থান করছেন। কিন্তু হামলার আগে লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কিত তথ্য যথেষ্টভাবে যাচাই বা হালনাগাদ করা হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

ফলে তদন্তকারীদের দৃষ্টিতে বিষয়টি কেবল সাধারণ সামরিক ভুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে পুরোনো তথ্য ব্যবহার এবং ভবনটির প্রকৃত ব্যবহার যাচাই না করাকে গুরুতর ত্রুটি হিসেবে দেখা হয়েছে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার দায় ইরানের ওপর চাপিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে ওই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর দায়ের বিষয়টি সামনে আসে।

এদিকে জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দল ইরানের লামার্দ শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রেও হামলার ঘটনা পর্যালোচনা করেছে। তদন্ত অনুযায়ী, ওই স্থাপনায় হামলার ফলে আশপাশের আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ২২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত অথবা আহত হন।

জাতিসংঘের তদন্তকারীরা লামার্দের ঘটনাটিকেও নির্বিচার হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, হামলার ধরন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং ঘটনাটি যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।

প্রতিবেদনে মূলত বেসামরিক জনগণ ও স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সামরিক অভিযানের সময় কোনো স্থাপনা সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না, সেটি যথাযথভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন প্রকাশের ফলে ইরানে ফেব্রুয়ারির হামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক স্থাপনায় সামরিক হামলার ক্ষেত্রে দায় ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version